যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬,৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রধান শিক্ষকের দ্রুত সিদ্ধান্তে বাঁচল ১,৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪০ PM | সর্বশেষ আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪২ PM ৭৯
প্রধান শিক্ষকের দ্রুত সিদ্ধান্তে বাঁচল ১,৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ

ছবি:সংগৃহীত

নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আশপাশের গ্রাম ভেসে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা করেছেন নেপালের এক প্রধান শিক্ষক।

নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বুধবার সকালে বন্ধুর কাছ থেকে বিপদের খবর পান। এরপর আর দেরি না করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে বন্ধুর কাছ থেকে সতর্কবার্তা পান ৪৭ বছর বয়সী রাজেন্দ্র দাওয়াদি।

তখন বিদ্যালয় ও আশপাশে অবস্থান করছিল ১ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষার্থী। তিনতলা স্কুল ভবনটি নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচু হওয়ায় শুরুতে সেটিকে নিরাপদ মনে করা হয়েছিল।

কিন্তু নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকার খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন প্রধান শিক্ষক।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে শিশুদের দ্রুত নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিতে বলেন।

এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্য শিক্ষার্থীদের পায়ে হেঁটে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রধান শিক্ষকও তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ স্থানের দিকে এগিয়ে যান।

শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। এর কিছুক্ষণ পরই ভয়াবহ বন্যার স্রোত বিদ্যালয়ের ভবনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। রাজেন্দ্র দাওয়াদির তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর সবাই প্রাণে রক্ষা পায়।

শিক্ষার্থীদের সবাই নিরাপদে সরে যেতে পারলেও বিদ্যালয়ের দুই কর্মীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

ইতিহাসের শিক্ষক সান্তোষ পারিয়ার (৩২) সকালে নাশতা রান্নার জন্য নদীর পাশে নিজের ভাড়া বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন। সেখানেই প্রবল স্রোতে ভেসে যান তিনি।

বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও স্কুলের দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে বন্যার পানিতে প্রাণ হারান।

শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষার পর স্থানীয়দের কাছে নায়ক হয়ে উঠেছেন রাজেন্দ্র দাওয়াদি। তবে নিজের ভূমিকার জন্য কোনো কৃতিত্ব নিতে রাজি নন তিনি।

বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আর কী করতে পারতাম?’

তাঁর এই প্রতিক্রিয়াই পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় তাঁর মানসিক অবস্থার ধারণা দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে লেন্দে খোলা নদীর খাড়া গিরিখাতে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ আছড়ে পড়ে। এরপর নদীপথে নেমে আসে প্রবল স্রোত। বরফ, পাথর, কাদা ও পানির সেই স্রোত বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-আকৃতিবিদ ড্যানিয়েল শুগারের হিসাব অনুযায়ী, ধসে পড়া বরফ ও পাথরের অংশটি প্রায় ৫০ একর এলাকা জুড়ে ছিল।

এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে দেওয়া সর্বশেষ হিসাবে নেপালে ৭৫০ জনের বেশি এবং তিব্বতে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

নেপালে এখনো প্রায় ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৪৬ জন বলে জানানো হয়েছে।

বন্যার পানিতে বহু ঘরবাড়ি, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেছে। পাহাড়ি নদীগুলো দিয়ে প্রবল স্রোত নেমে আসায় অনেক জনপদ অল্প সময়ের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

নেপালের এই পার্বত্য অঞ্চল আগেও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে।

২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৮ হাজার ৯৬২ জন প্রাণ হারান। ওই ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট তুষারধসে লাংটাং অঞ্চলেও প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এবার একই বিস্তীর্ণ পার্বত্য অঞ্চল ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে আবারও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

নেপাল বন্যা ২০২৬ প্রধান শিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধি ১৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!