ছবি:সংগৃহীত
ইরানকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতে। কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর উৎপাদন বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিদর্শক প্লাত্তে বি. মোরিংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সময় মার্কিন বাহিনী ব্যাপক পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এর ফলে অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্দিষ্ট ধরনের সামরিক সরঞ্জাম পুনরায় মজুত করতে তুলনামূলক বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
অভিযান চলাকালে মার্কিন বাহিনী বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জামও হারিয়েছে। এর মধ্যে চারটি এফ-১২ যুদ্ধবিমান, একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, সাতটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার এবং ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইরান অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ২ হাজার ২৩০ কোটি ডলার, ব্যয় হয়েছে অস্ত্র ও গোলাবারুদে।
সংঘাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটির বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে এসব স্থাপনা পুনর্নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় বর্তমান হিসাবের মধ্যে রাখা হয়নি। কারণ কোন স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হবে এবং এর অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংঘাতের কারণে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। সরকারি কর্মী, তাঁদের পরিবার, মার্কিন নাগরিক এবং নির্দিষ্ট তৃতীয় দেশের নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে প্রায় ৭ কোটি ৯২ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি আনুমানিক ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান সংঘাতের প্রভাব বোঝাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতাও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা বর্তমানে বছরে প্রায় ৭৫০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক মূল্য ৪০ লাখ ডলার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অস্ত্রের বর্তমান মজুত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতকে ঘিরে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে চীনের মতো বড় সামরিক শক্তির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে একই মাত্রার অস্ত্র সরবরাহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা নাকচ করেছেন। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করে দাবি করেছেন, দেশটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও উন্নত অস্ত্র তৈরি করছে।
তবে নতুন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বড় ধরনের সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত এবং দ্রুত পুনরায় উৎপাদনের সক্ষমতা—দুটিই বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধ অস্ত্রের ঘাটতি
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!