ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার গঠনের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে। ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না বলে বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট এবং বিরোধী নেতা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতেও সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছেন দুই নেতা, ফলে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। তবে নির্বাচনের পর প্রকাশিত প্রাথমিক জরিপে কোনো পক্ষই সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি।
ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল কান ১১ ও চ্যানেল ১৩-এর বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের জোট উভয়ের আসনসংখ্যা ৫১টি করে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে চ্যানেল ১২-এর জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি এবং বিরোধী জোট ৪৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই জরিপে কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গ্যভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৩ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
জরিপের ফল প্রকাশের পর জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির নির্বাচনী কার্যালয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি একটি শক্তিশালী ডানপন্থি জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানান। বক্তব্যে ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। নেতানিয়াহুর ভাষ্য, ইরানের কাছ থেকে ইসরায়েলের জন্য বিদ্যমান হুমকি দূর করার ক্ষেত্রে দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের মুখে রয়েছে।
অন্যদিকে ‘ইয়াশার’ পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট দাবি করেছেন, ভোটাররা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনসমর্থন ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেট হারিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তাকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার বিষয়েও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ভোটদানের হার এবং ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বুথফেরত জরিপ নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোটের জন্য চাপের ইঙ্গিত দিলেও চূড়ান্ত ফল এবং পরবর্তী জোট আলোচনা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। কোনো পক্ষ দ্রুত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার গঠন নিয়ে দর-কষাকষি দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমাধান না আসা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর দায়িত্বে থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনে আরব দলগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর প্রতি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ভোটারদের উল্লেখযোগ্য সমর্থনের কথাও উঠে এসেছে। আসনসংখ্যার হিসাবে এই জোট সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা আইজেনকোট প্রায় নাকচ করে দেওয়ায় তাঁর জোটের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ আরও কঠিন হতে পারে।
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট গাজা যুদ্ধে নিজের এক ছেলে ও দুই ভাতিজাকে হারিয়েছেন। তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অবস্থানের জন্য পরিচিত। তবে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, সামরিক অভিযান চালানো সত্ত্বেও হামাস কার্যকর থাকায় সরকারের যুদ্ধনীতি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইয়োহানান প্লেসনারের মতে, জরিপে নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কার ইঙ্গিত থাকলেও আইজেনকোটও স্পষ্ট বিজয়ী হিসেবে উঠে আসেননি। বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের মধ্যে চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চূড়ান্ত ফলেও কোনো পক্ষ সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলের নির্বাচন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!