ইরানের কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ সেন্ট বা ০ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৯৬ দশমিক ৬৬ ডলারে ওঠে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ৩ সেন্ট বা ০ দশমিক ০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ৮ ডলারে পৌঁছায়।
এর আগের দিন সোমবার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। ইরান ও কাতারের কর্মকর্তাদের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—উভয় ধরনের তেলের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। তবে কেশম দ্বীপে হামলার খবর নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এ অভিযানকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সীমিত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক পদক্ষেপের খবর জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনায় বাজার যখন কিছুটা আশ্বস্ত হচ্ছিল, তখন নতুন হামলার সংবাদ পরিস্থিতিকে আবার ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে দাম বৃদ্ধির মাত্রা সীমিত থাকাকে ভিন্নভাবে দেখছেন ফিলিপ নোভা প্রতিষ্ঠানের বাজার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্রিয়াঙ্কা সচদেবা। তাঁর মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি তেলের বর্তমান দামে আগে থেকেই অনেকটা প্রতিফলিত হয়েছে। সরবরাহ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে নতুন করে বিঘ্নের নির্দিষ্ট প্রমাণ না মিললে শুধু হামলার খবরের কারণে দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকার সম্ভাবনা কম।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ চালু থাকার কথা জানিয়েছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় কয়েক দিনের আলোচনায় বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সোমবার ইরানে নতুন সামরিক হামলার হুমকি কার্যকর করা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সংঘাতের আগে বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়েছে। দেশটিতে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংঘাত দ্রুত শেষ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপও বাড়ছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও ছড়ানোর আশঙ্কায় অক্টোবরের শেষ দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত ছয় মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়েও বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শান্তি আলোচনার বিষয়ে সরকারকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের অবসান, পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং উত্তেজনা কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে তেলের দাম
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!