যুক্তরাষ্ট্র   সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬,১৭ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়ছে, সংকটে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র

সাইফুল ইসলাম জয়

সাইফুল ইসলাম জয়

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ PM ৫৯
প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়ছে, সংকটে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র

সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রে প্রকৃতি ও পরিবেশের চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

প্রকৃতির বৈচিত্র্যের কারণে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল সিলেট। পাহাড়, নদী, ঝরনা, পাথর, হাওর ও সবুজের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জাফলং, সাদাপাথর, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল ও পান্তুমাইয়ে প্রতিবছর ছুটে যান অসংখ্য পর্যটক। তবে মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে এসব স্থানের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বালু ও পাথর তোলা, পাহাড় কাটা, যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা এবং পরিকল্পনাহীন স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক পর্যটনকেন্দ্রের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বদলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটনকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সিলেট ভ্রমণে আসা মানুষের অন্যতম পছন্দের জায়গা জাফলং। সীমান্তের ওপারের পাহাড়, সেখান থেকে নেমে আসা ঝরনা, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি, ডাউকি ঝুলন্ত সেতু, মায়াবী ঝরনা এবং খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন এ এলাকার আকর্ষণ বাড়িয়েছে। দেশের প্রথম সমতল চা-বাগানও রয়েছে এই অঞ্চলে। কিন্তু দীর্ঘদিনের বালু-পাথর উত্তোলন, দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত জাফলংয়ের প্রকৃতি এখন চাপের মধ্যে রয়েছে।

জাফলংয়ের মতো সাদাপাথরেও প্রকৃতির সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ নদী, পাথর ও পাহাড়। ধলাই নদীর স্বচ্ছ পানির ওপর ছড়িয়ে থাকা সাদা পাথরের দৃশ্য পর্যটকদের টানে। কিন্তু বালু-পাথর উত্তোলনের প্রভাবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিছানাকান্দির অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। জল ও পাথরের অনন্য সমন্বয়ের জন্য পরিচিত এই পর্যটনকেন্দ্রে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অবাধে পাথর উত্তোলন ও অন্যান্য পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এতে পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবেশ ও সৌন্দর্য দুটিই ক্ষতির মুখে পড়ছে।

সিলেটের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ রাতারগুল। মিঠাপানির এই জলাবনে বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকা গাছপালা, পাখির বিচরণ ও নৌভ্রমণ পর্যটকদের ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। কিন্তু নৌযানের সংখ্যা বাড়া, পানিতে বর্জ্য ফেলা, শব্দদূষণসহ বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমে জলাবনটির জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে লালাখালের স্বচ্ছ পানির সবুজাভ রং এবং পাহাড়ঘেরা পরিবেশ পর্যটকদের আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। সীমান্তঘেঁষা পান্তুমাইয়ের পাহাড়ি জলপ্রপাতও বর্ষায় বিশেষভাবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে এসব জায়গার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সিলেটের পর্যটন শুধু প্রাকৃতিক স্থাপনাকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়। চা-বাগান, খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর এবং হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসহ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থানগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ফলে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিস্তারের সুযোগ রয়েছে।

তবে পর্যটনের বিকাশে যোগাযোগব্যবস্থাও বড় একটি বিষয়। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দুরবস্থা, ট্রেনের টিকিটের সংকট এবং আকাশপথের তুলনামূলক বেশি ভাড়া পর্যটকদের ভ্রমণকে নিরুৎসাহিত করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পরিবার নিয়ে সিলেট ভ্রমণে আসা মানুষেরাও যাতায়াতে নানা সমস্যার মুখে পড়েন।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, সিলেটের পর্যটনের প্রধান ভিত্তি প্রকৃতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেই মানুষ এখানে আসে। কিন্তু প্রকৃতি রক্ষার বদলে ধ্বংসের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার মতে, প্রকৃতি রক্ষা করা গেলে সিলেটের পর্যটনও টিকে থাকবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। নতুন পর্যটন সম্ভাবনা খুঁজে বের করার পাশাপাশি সেগুলোকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি জৈন্তাপুরে সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনস্থলের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। পর্যটনের বিকাশে সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দিতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পর্যটকদের আকর্ষণের প্রধান কারণ যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সেটিই একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

সিলেট পর্যটনকেন্দ্র প্রকৃতি পরিবেশ জাফলং সাদাপাথর বিছানাকান্দি রাতারগুল লালাখাল পান্তুমাই ভ্রমণ পর্যটন মন্ত্রণালয়

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!