রাশিয়ার একটি ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নথি ও শিপিং তথ্যের বরাতে চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ড্রোন তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ সরবরাহের তথ্য সামনে এসেছে। বেইজিং অবশ্য প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাশিয়ার সামরিক ড্রোন উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের একটি চালান চীন থেকে দেশটিতে পাঠানো হয়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নথি ও শিপিং রেকর্ড বিশ্লেষণে। দ্য টেলিগ্রাফ ও পলিটিকোর যৌথ অনুসন্ধান অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জিলিন কেমিক্যাল ফাইবার গ্রুপ চলতি বছরের শুরুতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ৪৬ টন কার্বন ফাইবার তৈরির রাসায়নিক উপকরণ পাঠায়।
নথিতে দেখা যায়, এসব উপকরণ রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলের আলাবুগা-ভলোকনো নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পৌঁছায়। প্রতিষ্ঠানটি রোসাটমের উন্নত উপকরণ ও কম্পোজিট বিভাগ উমাটেক্সের সহযোগী। আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানায় উচ্চমানের কার্বন ফাইবার উৎপাদন করা হয়, যা রাশিয়ার দীর্ঘপাল্লার ‘গেরান’ কামিকাজি ড্রোন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শিপিং নথিতে দুইটি ৪০ ফুট কনটেইনারে সর্বোচ্চ ৪৬ টন ‘পলিঅ্যাক্রিলোনাইট্রাইল টো’ পাঠানোর তথ্য রয়েছে। এই উপাদান সামরিক মানের হালকা কার্বন ফাইবার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ডেভিড অলব্রাইটের মতে, যথাযথ কাস্টমস কোড ব্যবহার করা হলে পণ্যটি দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সুযোগ ছিল।
তবে চালানের নথিতে সাধারণ সিনথেটিক ফাইবারের জন্য ব্যবহৃত কাস্টমস কোড ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। সাবেক মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তা কেরি বিটসফের মতে, কাস্টমস কোডে এমন অসঙ্গতি থাকলে তা সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনের বিষয়টি আড়াল করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিতে পারে।
চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। বিপরীতে আলাবুগা-ভলোকনো ও উমাটেক্স ২০২৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। ইউক্রেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নিউজিল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ডও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ইউক্রেনভিত্তিক ইউক্রেনিয়ান সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন সেন্টার (ইউএসসিসি) জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে জিলিন কেমিক্যাল ফাইবার গ্রুপ থেকে আলাবুগা-ভলোকনোর উদ্দেশে প্যান-প্রিকারসর পাঠানোর অন্তত আটটি দরপত্রের তথ্য তারা শনাক্ত করেছে। সংগঠনটির দাবি, নতুন নথিগুলো চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক-শিল্প খাতের সরাসরি সরবরাহ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
ইউএসসিসির প্রধান সেরহি কুজানের দাবি, চীনের সহায়তায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। তার মতে, এসব অস্ত্রের একটি অংশ পরে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অলব্রাইট বলেছেন, পাওয়া নথির ভিত্তিতে চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, জিলিন থেকে পাঠানো প্যান-প্রিকারসর দিয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কামিকাজি ড্রোনের প্রয়োজনীয় কার্বন ফাইবার তৈরি করা সম্ভব।
কার্বন ফাইবার ড্রোনের কাঠামোগত বিভিন্ন অংশকে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ডানা, অভ্যন্তরীণ কাঠামো, জ্বালানি ট্যাংক ও ইঞ্জিনের আশপাশের অংশ রয়েছে। ইউএসসিসির হিসাবে, আলাবুগা-ভলোকনোর উৎপাদনের প্রায় ৮৯ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যাওয়ার কথা। প্রতিষ্ঠানটি বিমান, রকেট, ড্রোন, জাহাজ ও সাঁজোয়া যান তৈরিতে ব্যবহারের জন্য কার্বন ফাইবারভিত্তিক ৩৯ ধরনের পণ্য তৈরি করে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
এ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, চীন রাশিয়াকে এমন দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য সরবরাহ করছে, যেগুলো বেসামরিক কাজের পাশাপাশি সামরিক উৎপাদনেও ব্যবহার করা সম্ভব। মার্কিন কংগ্রেসের চীনবিষয়ক সিলেক্ট কমিটির আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ও হংকং থেকে আসা এ ধরনের পণ্য পশ্চিমা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও রাশিয়ার অস্ত্র কর্মসূচিকে সচল রাখতে সহায়তা করছে।
জার্মান অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিল ইনস্টিটিউটের জুনের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সামরিক শিল্প সচল রাখতে প্রয়োজনীয় উপাদানের ৬০ শতাংশের বেশি চীন সরবরাহ করছে। সাবেক মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ট ক্যাম্পবেলের দাবি, রাশিয়ার সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহ করছে এমন চীনা কোম্পানির সংখ্যা কয়েক ডজন।
তবে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস বলেছে, এসব দাবি চীনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও দায় চাপানোর চেষ্টা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চীন কখনোই সংঘাতের কোনো পক্ষকে প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ করেনি এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও বলেছিলেন, চীন সংঘাতে উসকানি দেবে না এবং যুদ্ধ থেকে মুনাফা করবে না।
রোসাটমও অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্রের ভাষ্য, রোসাটম ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান মেনেই পরিচালিত হয়। এর বিপরীত যেকোনো দাবি মিথ্যা এবং রাশিয়ার কাস্টমস ব্যবস্থার বিষয়ে অপর্যাপ্ত ধারণার প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। চীনের জিলিন কেমিক্যাল ফাইবার গ্রুপের কাছে একাধিকবার মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, রাশিয়া যাতে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সরবরাহ নেটওয়ার্ক ও চ্যানেল বন্ধ করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটি এবং ইউক্রেন সরকার নথিগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলো প্রামাণিক বলে নিশ্চিত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারাও অভিযোগ করেছেন, এত বড় ধরনের চালান সরকারের অজ্ঞাতে হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে চীনা সরকার এ ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
রাশিয়া ড্রোন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!