যুক্তরাষ্ট্র   সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্রীলঙ্কার চেম্মানিতে গণকবর, উদ্ধার ৫৭২ জনের কঙ্কাল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫ PM
শ্রীলঙ্কার চেম্মানিতে গণকবর, উদ্ধার ৫৭২ জনের কঙ্কাল

ছবি: রয়টার্স।

শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি গণকবর থেকে ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের মধ্যে শিশু ও নবজাতকেরও কঙ্কাল রয়েছে। তবে এসব মানুষের পরিচয় এবং মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।

চেম্মানিতে শ্মশান সম্প্রসারণের জন্য খননকাজ চলার সময় গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম মানবদেহের অবশিষ্টাংশের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর কয়েক ধাপে খনন চালিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদরা বিপুলসংখ্যক কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করেন। ঘটনাস্থল থেকে চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও দুধের বোতলের মতো ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গেছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন ও মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশের ধারণা, দেহাবশেষগুলোর সঙ্গে শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ বা নিহত বেসামরিক মানুষের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

চেম্মানি এলাকায় এর আগেও গণকবরের অভিযোগ উঠেছিল। ১৯৯৫ সালে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখানে সেনা ক্যাম্প ও চেকপয়েন্ট স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকার কাছাকাছি বহু মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।

১৯৯৬ সালে চেম্মানির কাছে একটি চেকপয়েন্ট থেকে কান্দাইয়া জয়পালানকে সেনাবাহিনী আটক করে নিয়ে যায় বলে তার মেয়ে জেয়ারুবি জয়পালান জানিয়েছেন। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

চেম্মানি এলাকায় তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও গৃহযুদ্ধের সময়কার গুরুতর মানবাধিকার অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে। ওই মামলায় পাঁচ সেনাসদস্যের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। পরে চেম্মানি এলাকায় কৃষান্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ পাওয়া যায়।

ওই মামলায় দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্য পরে দাবি করেছিলেন, চেম্মানিতে ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে সেখানে খনন চালিয়ে ১০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। নতুন গণকবরটি আগের স্থানটির কাছাকাছি হওয়ায় পুরোনো অভিযোগগুলোও আবার আলোচনায় এসেছে।

শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলোর বেশিরভাগ অগভীর ও ঘনভাবে সমাহিত ছিল। কমিশন এসব সমাহিতকরণ অবৈধ হওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে। তবে চূড়ান্তভাবে মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন।

বর্তমানে চেম্মানি থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের হেফাজতে রয়েছে। এখনো ডিএনএ পরীক্ষা শুরু হয়নি। দেহাবশেষের বয়স ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে আরও পরীক্ষা চালানো হবে। প্রয়োজন হলে কিছু নমুনা বিদেশেও পাঠানো হতে পারে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকেও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আশা করছেন, এই পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হন। সংঘাতের সময় নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছিল। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দশকে ২০টির বেশি গণকবরের সন্ধান মিললেও সেগুলোর কোনোটিকেই জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা যায়নি।

২০১৮ সালে মান্নারে একটি গণকবর থেকে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই তদন্তও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। এ কারণে চেম্মানির নতুন অনুসন্ধান নিয়েও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, চেম্মানির তদন্তে সহযোগিতা করা হচ্ছে। বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারার ভাষ্য অনুযায়ী, খননকাজ অব্যাহত থাকবে এবং উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী চেম্মানিতে যুদ্ধের সময় বেসামরিকদের গণহারে সমাহিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণের কথা জানিয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের জন্য ২০১৮ সালে অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স (ওএমপি) গঠন করা হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটি অংশ এর অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুদ্ধকালীন নিখোঁজ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং জবাবদিহির দাবি করে আসছে।

চেম্মানি থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার ফল এখন এই তদন্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদের পরিচয় এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!