জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি খাতে ২ শতাংশ বাজেট বরাদ্দের দাবি তুলে ধরেন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিককর্মী সংঘের নেতৃবৃন্দ। ছবি: সংগৃহীত
দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ন্যূনতম ২ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিককর্মী সংঘ। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়; এটি একটি জাতির মানবিক নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিককর্মী সংঘের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আ মা ম হাসানুজ্জামান। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শাহ আলম।
লিখিত বক্তব্যে খন্দকার শাহ আলম বলেন, দেশের বিশিষ্ট শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক সংগঠকদের অংশগ্রহণে ২০০৫ সালে একটি গোলটেবিল বৈঠকে সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশে ১৫ দফা প্রস্তাবনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এসব প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে জমা দেওয়া হলেও অধিকাংশ সুপারিশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পীদের কল্যাণ, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও গবেষণা সম্প্রসারণ এবং জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থে জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সংস্কৃতিচর্চা একটি সমাজকে মানবিক, সহনশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলে। সামাজিক অবক্ষয়, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং মাদকাসক্তির মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক ছটকু আহমেদ বলেন, “সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যবোধে বিনিয়োগ। জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি এবং সুস্থ সমাজ গঠনে সংস্কৃতির বিকল্প নেই। যুবসমাজকে সামাজিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটাতে হবে।”
সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও অভিনেতা আব্দুল আজিজ বলেন, সংস্কৃতির মাধ্যমেই একটি জাতির মূল্যবোধ টিকে থাকে। সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজের নৈতিক ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কবি শিরিন বেগম বলেন, “আমরা শুধু শিল্পীদের জন্য বরাদ্দ চাই না, আমরা দেশের সাংস্কৃতিক বলয়কে শক্তিশালী করতে চাই। তাই সংস্কৃতি খাতে ২ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ এখন সময়ের দাবি।”
সাহিত্যিক ও গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম সংস্কৃতি। সংস্কৃতিই মানুষকে সহনশীলতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা দেয়।
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক এম. এ. হামিদ বলেন, একটি দেশের মূল শক্তি তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতির যথাযথ পরিচর্যা ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ বিকাশ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ শর্টফিল্ম সোসাইটির চেয়ারম্যান হুসনে মোবারক বলেন, একটি দেশের পরিচয় ও ঐতিহ্যের ভিত্তি হলো তার সংস্কৃতি। জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দকে তিনি মানবিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন, নাট্যকার মতিউর রহমান রানা, শিল্পী ফয়জুল আলম পাপ্পু, যাত্রা সংগঠক গাজী আব্দুর রাজ্জাক, খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব বক্তব্য দেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ২০০৫ সালে প্রণীত ১৫ দফা সাংস্কৃতিক প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি আগামী জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ন্যূনতম ২ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বক্তারা বলেন, একটি সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও সৃজনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সংস্কৃতির বিকল্প নেই। তাই টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করতে সংস্কৃতিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!