যুক্তরাষ্ট্র   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১ আশ্বিন ১৪৩৩

ওয়েম্বলিতে প্রথম পাঞ্জাবি হেডলাইনার দিলজিৎ দোসাঞ্জ

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৫ PM ১৯
ওয়েম্বলিতে প্রথম পাঞ্জাবি হেডলাইনার দিলজিৎ দোসাঞ্জ

লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে পারফর্ম করছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। ছবি: সংগৃহীত

পাঞ্জাবি সংগীতের জন্য নতুন এক মাইলফলক তৈরি করলেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। লন্ডনের ঐতিহাসিক ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে শনিবার রাতে একক কনসার্টে প্রধান শিল্পী হিসেবে মঞ্চে ওঠেন তিনি। ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই ভেন্যুতে হেডলাইনার হিসেবে একক কনসার্ট করা প্রথম পাঞ্জাবি সংগীতশিল্পী দিলজিৎ।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতের আয়োজনের শুরুতেই তাঁর পরিচিত উচ্ছ্বাস—‘পাঞ্জাবি আ গেয়ে ওয়েম্বলি ওয়ে!’—শোনা যায়। ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবি পোশাকে মঞ্চে উঠে হাজারো দর্শকের সামনে নিজের জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন তিনি। এ সময় দিলজিৎ বলেন, ‘এই মুহূর্তটি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’

রাত ৮টার কিছু পর শুরু হওয়া কনসার্ট চলে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। ৯০ হাজার আসনের স্টেডিয়ামে দর্শকদের বড় একটি অংশ ছিলেন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত। ‘জি. ও. এ. টি’ (G. O. A. T.), ‘লাভার’, ‘হাস হাস’ ও ‘বর্ন টু শাইন’-এর মতো গান পরিবেশনের সময় পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে তৈরি হয় উচ্ছ্বাস।

পাঞ্জাবি লোকসংগীতের সঙ্গে র‍্যাপ ও হিপ-হপের মিশ্রণে সাজানো পরিবেশনায় দর্শকেরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কেউ গান গেয়ে, কেউ নেচে, আবার কেউ হাতে আলো জ্বালিয়ে শিল্পীর সঙ্গে উদ্‌যাপনে যোগ দেন। সামনের সারির দর্শকদের অনেকেই দিলজিতের নাচের মুদ্রা অনুসরণ করেন।

কনসার্টের আগে দুপুর থেকেই ওয়েম্বলির বাইরে ভক্তদের ভিড় বাড়তে থাকে। তাঁদের মধ্যে এক ভক্ত বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের কাছে তাঁর অবস্থান মাইকেল জ্যাকসন বা ম্যাডোনার পর্যায়ে। তিনি দেখতে যেমন সুপুরুষ, ব্যক্তিত্বেও তেমনি বিনয়ী।’

মঞ্চের বড় আয়োজনের মধ্যেও দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেন দিলজিৎ। একপর্যায়ে কয়েকজন ভক্তকে, শিশু থেকে শুরু করে এক প্রবীণ নারীকে, মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে সেলফি তোলেন এবং উপহারও দেন।

স্টেডিয়ামের পেছনের সারিতে থাকা দর্শকদের কথাও আলাদা করে স্মরণ করেন এই শিল্পী। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যারা পেছনে আছেন, তাঁদের হৃদয় অনেক বড়।’ এরপর তাঁদের জন্য করতালি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের মাঝেই ভারতের দর্শকদের জন্য নতুন ঘোষণা দেন দিলজিৎ। আগামী নভেম্বরে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে কনসার্ট করার কথা জানান তিনি। শেষদিকে তাঁর আবেগঘন গান ‘ম্যায় হুঁ পাঞ্জাবি’ পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। ছিল জমকালো আতশবাজির আয়োজনও।

কনসার্ট শেষে অমিত ও রানি নামের এক দম্পতি বিবিসিকে বলেন, ‘এটি এক অবিশ্বাস্য শো ছিল! এনার্জি ও পরিবেশ ছিল এককথায় অতুলনীয়। আমরা দিলজিতের ভক্ত এবং যুক্তরাজ্যে তাঁর সব কনসার্টেই গিয়েছি। কিন্তু আজকের ঘটনাটি ছিল একেবারেই অন্যরকম—ইতিহাসের অংশ হওয়ার মতো মুহূর্ত।’

তাঁদের মতে, অনুষ্ঠানটি শুধু একটি সংগীত আয়োজন ছিল না; পাঞ্জাবি সংস্কৃতির জন্যও এটি ছিল বিশেষ উদ্‌যাপনের সময়।

গ্রাম থেকে বিশ্বমঞ্চে

পাঞ্জাবের একটি সাধারণ গ্রাম থেকে উঠে আসা দিলজিৎ গত দুই দশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোচেল্লা’ সংগীত উৎসবে পারফর্ম করে প্রথম পাঞ্জাবি গায়ক হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি। পরে ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবি পোশাকে ‘মেট গালা’তেও অংশ নেন।

আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাঁর একক কনসার্টের টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এড শিরান ও সিয়ার মতো আন্তর্জাতিক তারকার সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করেছেন তিনি। মার্কিন টক-শো হোস্ট জিমি ফ্যালনের সঙ্গে ভাংড়া নাচেও দেখা গেছে তাঁকে। ফ্যালন প্রকাশ্যেই দিলজিৎকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঞ্জাবি শিল্পী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

দিলজিতের জনপ্রিয়তার পেছনে নিজের শিকড়ের সঙ্গে তাঁর সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ। পাঞ্জাবি সংস্কৃতির পরিচায়ক পোশাক, পাগড়ি ও মাতৃভাষায় গান—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেন। সংগীতের পাশাপাশি বলিউডের চলচ্চিত্রেও অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

ওয়েম্বলির মঞ্চে ওঠার আগে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দিলজিৎ জানান, এত বড় স্টেডিয়ামে কনসার্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেকে তাঁকে বিষয়টি নিয়ে আবার ভাবতে বলেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘যা হওয়ার হবে, আমরা দেখব। আমি চাই আমাদের মানুষ আনন্দ পাক এবং গর্বের সঙ্গে বলুক—হ্যাঁ, আমরাও এটা করতে পারি!’

ওয়েম্বলিতে বিশ্বের বড় বড় শিল্পীদের পারফরম্যান্সের প্রসঙ্গ তুলে নিজের অনুভূতিও জানান তিনি। দিলজিৎ বলেন, ‘হ্যারি স্টাইলসের মতো শিল্পীদের জন্য এই মঞ্চে পারফর্ম করা খুব সাধারণ বিষয় হতে পারে, কিন্তু আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত বিশেষ। একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে এসে ওয়েম্বলির মতো জায়গায় পৌঁছানো সত্যিই অনেক বড় একটি অর্জন।’

নিজের এই অর্জনকে সামনে রেখে আগামী প্রজন্ম ও দেশের মানুষের কথা উল্লেখ করে দিলজিৎ বলেন, ‘আমি ভীষণ তৃপ্ত ও আনন্দিত। নিজের দেশের মানুষের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য আমার ভীষণ ভালো লাগছে।’

দিলজিৎ দোসাঞ্জ

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!