ছবি:সংগৃহীত
তীব্র গরমে শরীর স্বাভাবিক রাখতে ঘাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছু ওষুধ শরীরের ঘাম, রক্তচাপ, পানি-লবণের ভারসাম্য কিংবা তাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এসব ওষুধ সেবনকারীদের গরমে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তবে ওষুধের নাম শুনে নিজে থেকে সেবন বন্ধ বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়। কোন ওষুধ আপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা রোগ, বয়স, ডোজ এবং অন্যান্য ওষুধের ওপরও নির্ভর করে।
কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট শরীরের ঘাম ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কিছু ট্রাইসাইক্লিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ঘাম কমিয়ে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টে অতিরিক্ত ঘামও হতে পারে।
গরমের মধ্যে বেশি ঘাম হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ কমে গিয়ে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এডিএইচডির চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু উদ্দীপক ওষুধ শরীরের তাপ উৎপাদন এবং রক্তসঞ্চালনে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের সময় বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে যারা নিয়মিত এসব ওষুধ সেবন করেন, তাঁদের গরমে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ ও শরীর ঠান্ডা রাখার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইইউরেটিক বা পানি কমানোর ওষুধ শরীর থেকে পানি ও লবণ বের করে দেয়। গরমে অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে এটি যোগ হলে পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ACE inhibitor ও ARB-সহ কিছু হৃদ্যন্ত্র ও রক্তচাপের ওষুধও গরম ও পানিশূন্যতার পরিস্থিতিতে শরীরের ওপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে পারে। পানিশূন্যতা বেশি হলে কিডনির ওপরও চাপ পড়তে পারে।
হৃদরোগের কিছু ওষুধ
বিটা-ব্লকারসহ কিছু হৃদরোগের ওষুধ ত্বকের রক্তপ্রবাহ ও শরীরের তাপ বের করে দেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রচণ্ড গরমে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি বা একাধিক ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে গরমজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা ভালো।
কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন ও অ্যান্টিকোলিনার্জিক ওষুধ ঘাম কমিয়ে দিতে পারে। এতে শরীরের স্বাভাবিকভাবে তাপ কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ধরনের ওষুধ ঠান্ডা-অ্যালার্জি, বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং অন্য কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
গরমের সঙ্গে ওষুধের পারস্পরিক প্রভাব শুধু ওপরের কয়েকটি শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু অ্যান্টিসাইকোটিক, পারকিনসন রোগের নির্দিষ্ট ওষুধ, মাংসপেশির খিঁচুনির ওষুধ এবং কিছু অন্যান্য ওষুধও শরীরের ঘাম, তাপ নিয়ন্ত্রণ বা পানি-লবণের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ সেবন করলে গরমের সময়ে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে ওষুধটির সম্ভাব্য তাপ-সংক্রান্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা নিরাপদ।
গরমে অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
- পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় তরল পান করুন।
- দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকা এড়িয়ে চলুন।
- দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম কমান।
- সম্ভব হলে ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা জায়গায় বিশ্রাম নিন।
- বাইরে কাজ করলে নিয়মিত বিরতি নিন।
- অতিরিক্ত ঘাম হলে পানিশূন্যতার লক্ষণ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।
- নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে গরমের সময় বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন আছে কি না, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
গরমে অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, পেশিতে টান বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া এবং তরল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তবে বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ, অচেতন হয়ে যাওয়া বা শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা হিটস্ট্রোকের ইঙ্গিত হতে পারে এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
গরমে কোনো ওষুধের কারণে অস্বস্তি হচ্ছে মনে হলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ কমানো ঠিক নয়। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বিষণ্নতা বা এডিএইচডির চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে মূল রোগের সমস্যা বাড়তে পারে।
বরং চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানিয়ে জেনে নিন—গরমে আপনার ওষুধের কারণে কোনো বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে কি না এবং কীভাবে তা কমানো যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গরমে ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা নয়; বরং ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জেনে নিরাপদে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া।
গরমে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ অ্যান্টিহিস্টামিন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!