যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ১৪ অক্টোবর ২০২৬,২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

হঠাৎ কেন প্রিয় মানুষটিকে দেখতে মন চায়?

সাইফুল ইসলাম জয়

সাইফুল ইসলাম জয়

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১২ PM ৯৫
হঠাৎ কেন প্রিয় মানুষটিকে দেখতে মন চায়?

পুরোনো স্মৃতি, পরিচিত কোনো জায়গা কিংবা একটি গন্ধও কখনো ফিরিয়ে আনতে পারে প্রিয় কোনো মানুষকে। প্রতীকী ছবি

কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই একজন মানুষের কথা মনে পড়ে। কোনো ফোনকল হয়নি, কথা হয়নি, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই—তবু হঠাৎ মনে হয়, মানুষটিকে একবার সামনে থেকে দেখতে ইচ্ছে করছে। এই ইচ্ছার পেছনে সব সময় নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা থাকে না। কখনো একটি বিকেল, পরিচিত কোনো রাস্তা, বাতাসে ভেসে আসা কোনো গন্ধ কিংবা বহুদিন না শোনা একটি গান সেই অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে।

মানুষের স্মৃতি বড় অদ্ভুত। সময়ের সঙ্গে অনেক ঘটনা ঝাপসা হয়ে যায়, অনেক মুখও ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। অথচ কোনো কোনো মুহূর্ত ঠিক আগের মতোই থেকে যায়। পুরোনো একটি সড়ক, পাখির ডাক, বিকেলের বাতাস কিংবা এক কাপ চায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি হঠাৎ বর্তমানের মধ্যে ফিরে আসে। তখন মনে হয়, এত বছর পরও সেই মানুষটির সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছেটা কেন এত তীব্র?

সম্ভবত কারণটা মানুষটির মধ্যে যতটা, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়ের মধ্যে তার চেয়ে বেশি। আমরা অনেক সময় কাউকে দেখতে চাই মানে শুধু তার মুখটি দেখতে চাই না। দেখতে চাই নিজের জীবনের একটি পুরোনো অধ্যায়কে। ফিরে যেতে চাই এমন এক সময়ে, যখন সম্পর্কটি সহজ ছিল, কথাগুলো অনায়াসে বলা যেত এবং একটি বিকেলও মনে হতো অনেক দীর্ঘ।

তখন মনে হতে পারে, তাকে শুধু একটি প্রশ্ন করা যায়—‘তোমার কি একটু সময় হবে?’ খুব বেশি কিছু নয়। পুরো দিন নয়, দীর্ঘ কোনো আয়োজনও নয়। হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য দেখা। কিংবা কোনো এক বিকেলে পাশাপাশি বসে থাকা। পুরোনো হিসাব মেলানোর প্রয়োজন নেই, কে আগে দূরে সরে গেল বা কার ভুল বেশি ছিল—এসব নিয়েও কথা বলতে হবে না। শুধু দেখা হওয়াটাই হয়তো যথেষ্ট।

কিন্তু দেখা করার জায়গাটাও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মানুষের স্মৃতিতে কিছু স্থান শুধু স্থান হিসেবে থাকে না। একটি রাস্তা হয়ে ওঠে প্রথম পরিচয়ের সাক্ষী, কোনো ক্যাফে হয়ে যায় দীর্ঘ আলাপের স্মৃতি, আবার কোনো বইয়ের দোকান মনে করিয়ে দেয় এমন একজনকে, যার সঙ্গে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো হয়েছিল।

বেঙ্গল গ্যালারির মতো একটি জায়গাও তাই কারও কাছে কেবল বই দেখার স্থান নয়। সেখানে হয়তো বইয়ের তাক ঘুরে দেখা হয়েছে, পছন্দের বই নিয়ে কথা হয়েছে, কোনো বই হাতে নিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়েছে। এরপর এসেছে চা। হয়তো কী খাওয়া হয়েছিল, তার বিস্তারিত আর মনে নেই। কিন্তু পাশাপাশি বসে থাকার অনুভূতিটা থেকে গেছে।

এটাই স্মৃতির শক্তি। খাবারের স্বাদ হারিয়ে যেতে পারে, কথার অনেক অংশ ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু কার সঙ্গে সেই সময়টা কেটেছিল—সেটি অনেক সময় মনের কোথাও অক্ষত থাকে। কোনো একটি নাম শুনলেই সেই মানুষটির হাসি মনে পড়ে। কোনো গন্ধে মনে পড়ে তার কাছাকাছি থাকার মুহূর্ত। কোনো নির্দিষ্ট বিকেল আবার ফিরিয়ে আনে বহু বছর আগের একটি দিন।

কিছু সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট নামও থাকে না। তাদের বন্ধুত্ব বলা যায়, কিন্তু শুধু বন্ধুত্ব বললে অনুভূতিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আবার ভালোবাসা বললেও হয়তো সম্পর্কটির পুরো অর্থ প্রকাশ পায় না। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে এমনভাবে আসে, যাদের সঙ্গে সম্পর্কের সংজ্ঞার চেয়ে একসঙ্গে কাটানো সময়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই সম্পর্কগুলো কখনো খুব স্বাভাবিকভাবেই দূরে সরে যায়। প্রথমে মনে হয়, আজ ব্যস্ত আছি, পরে কথা হবে। তারপর আসে আরেকটি দিন। সেই দিনও দেখা হয় না। একসময় ‘পরে’ শব্দটি দীর্ঘ হতে হতে এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে আর কেউ জানে না শেষবার কবে কথা হয়েছিল।

জীবনও তখন নিজের গতিতে চলতে থাকে। নতুন মানুষ আসে, নতুন কাজ, নতুন শহর, নতুন ব্যস্ততা তৈরি হয়। ফোনবুকে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। অথচ কোনো একজনের অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তখনই হয়তো মনে হয়—একবার দেখা হলে কেমন হতো?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ অতীতে ফিরে যায়। কোনো পুরোনো গান শুনে, বইয়ের পাতা উল্টে, পরিচিত কোনো গন্ধ পেয়ে কিংবা সেই পুরোনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আশ্চর্যের বিষয়, শহর বদলে যায়, ভবন বদলে যায়, রাস্তার মোড় বদলে যায়, পুরোনো গাছও হয়তো আর থাকে না; কিন্তু মনের ভেতরের সেই জায়গাটি বদলায় না।

স্মৃতির রাস্তা বাস্তব রাস্তার মতো নয়। সেখানে সময় থেমে থাকে। যে বিকেলে পাখির ডাক শোনা গিয়েছিল, সেই ডাক আজও সেখানে শোনা যায়। যে বাতাস একদিন পরিচিত কারও চুলের গন্ধ নিয়ে এসেছিল, স্মৃতির ভেতর সেই বাতাসও যেন একই রকম থাকে।

মানুষের ইন্দ্রিয়ও স্মৃতিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে অদ্ভুত ভূমিকা রাখে। একটি গন্ধ অনেক বছর আগের মুহূর্তকে চোখের সামনে এনে দিতে পারে। কোনো শব্দ মনে করিয়ে দিতে পারে একটি নির্দিষ্ট দিন। কোনো স্পর্শের স্মৃতিও সময়ের সঙ্গে মুছে না গিয়ে আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে।

হয়তো সেই কারণেই কখনো কাউকে দেখতে ইচ্ছে করলে আসলে তার সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি নিজের হারিয়ে যাওয়া সময়টাকেও একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।

অতীতকে আমরা প্রায়ই শেষ হয়ে যাওয়া সময় হিসেবে দেখি। অথচ অতীত পুরোপুরি শেষ হয় না। সেটি আমাদের ভেতরেই কোনো না কোনোভাবে থেকে যায়। দরজা বন্ধ থাকে, কিন্তু চাবিটি কোথাও হারিয়ে যায় না। একটি গান, একটি ছবি, একটি বই কিংবা হঠাৎ শোনা কোনো নাম সেই দরজা খুলে দিতে পারে।

তারপর মনে হয়, মানুষটি যদি এখন সামনে এসে দাঁড়ায়, প্রথম কথাটা কী হবে?

সম্ভবত খুব সাধারণ কিছু। ‘কেমন আছ?’

এই ছোট প্রশ্নের মধ্যেই হয়তো জমে থাকবে বহু বছরের না বলা কথা। দুজনের জীবনই হয়তো বদলে গেছে। দুজনেই হয়তো আগের মানুষটি নেই। তবু কথার শুরু করতে বেশি কিছু লাগবে না। কারণ কিছু সম্পর্কের দূরত্ব যত দীর্ঘই হোক, পরিচিতির জায়গাটি পুরোপুরি মুছে যায় না।

তবে কাউকে দেখতে চাওয়ার অর্থ সব সময় তাকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়। কখনো সেখানে কোনো দাবি থাকে না। থাকে না সম্পর্কটিকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাও। শুধু জানতে ইচ্ছে করে, সময় মানুষটিকে কতটা বদলে দিয়েছে।

সে কি এখনো বই পড়তে ভালোবাসে? এখনো কি চায়ের কাপ হাতে দীর্ঘ সময় গল্প করতে পারে? পুরোনো দিনের কোনো কথা মনে পড়লে কি তারও হাসি পায়? হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর কখনো জানা হবে না। তবু প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে থেকে যায়।

আর তাই কোনো একদিন যদি সত্যিই দেখা করার সুযোগ আসে, হয়তো খুব বেশি কিছু বলার দরকার হবে না। পুরোনো কোনো জায়গায় বসা যেতে পারে। একটি বই হাতে নেওয়া যেতে পারে। চায়ের কাপ সামনে রাখা যেতে পারে। তারপর কথার চেয়ে নীরবতাই হয়তো বেশি সময় ধরে থাকবে।

দুজন মানুষ তখন বুঝতে পারবে, সময় তাদের বদলে দিয়েছে। জীবনে নতুন অধ্যায় এসেছে। অনেক ঘটনা ঘটেছে, অনেক কিছু হারিয়েছে, আবার অনেক কিছু পাওয়া গেছে। তবু একটি পুরোনো বিকেল তাদের দুজনের মধ্যেই কোথাও রয়ে গেছে।

আজকের পৃথিবীতে দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা খুব সহজ। ফোন আছে, বার্তা পাঠানোর সুযোগ আছে, ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডেই পুরোনো কোনো ছবিও সামনে চলে আসে। তারপরও কাউকে সামনে বসে দেখার আকাঙ্ক্ষা কমে না।

কারণ পর্দায় মুখ দেখা যায়, কিন্তু পাশে বসার অনুভূতি পাওয়া যায় না। ছবিতে হাসি দেখা যায়, কিন্তু সেই হাসির শব্দ শোনা যায় না। ভিডিও কলে কথা বলা যায়, কিন্তু নীরবে পাশাপাশি বসে থাকার অভিজ্ঞতা সেখানে তৈরি হয় না।

সম্ভবত এ কারণেই ‘তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে’ কথাটি এত সহজ হয়েও এত গভীর। এর মধ্যে কখনো ভালোবাসা থাকে, কখনো বন্ধুত্ব, কখনো অভিমান, কখনো কেবল স্মৃতি। আবার কখনো থাকে এমন এক অনুভূতি, যার কোনো নির্দিষ্ট নামই নেই।

জীবনের সব মানুষ আমাদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকে না। কেউ দূরে চলে যায়, কেউ অন্য জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ যোগাযোগের বাইরে চলে যায়। এমনও হয়, খুব কাছের একজন একসময় অপরিচিতের মতো হয়ে ওঠে। কিন্তু স্মৃতির কাছে এসব দূরত্বের কোনো গুরুত্ব নেই।

স্মৃতি নিজের মতো করে মানুষকে ফিরিয়ে আনে। কখনো একটি পাখির ডাকে, কখনো পুরোনো রাস্তার দৃশ্যে, কখনো এক কাপ চায়ে, আবার কখনো নিঃশব্দ কোনো বিকেলে।

তখন হঠাৎ মনে হয়, অনেক কিছু বলার দরকার নেই। কোনো পুরোনো হিসাবও মেলাতে হবে না। শুধু মানুষটিকে একবার দেখা দরকার। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও।

হয়তো দেখা হলে দুজনের কেউই আগের দিনের মতো থাকবে না। তবু সেই সাক্ষাৎ প্রমাণ করতে পারে—কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে গেলেও তাদের স্মৃতি শেষ হয় না।

আর সেই কারণেই কোনো এক নিরিবিলি বিকেলে, জানালার পাশে বসে কিংবা পুরোনো কোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনের ভেতর থেকে একটি বাক্য উঠে আসতে পারে—আজ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কোনো দাবি নিয়ে নয়, কোনো প্রত্যাশা নিয়েও নয়। শুধু একবার দেখা হবে, একটু পাশাপাশি বসা হবে, আর হয়তো বুঝে নেওয়া যাবে—সময়ের এতটা পথ পেরিয়েও কিছু মানুষ কেন আমাদের ভেতরে একই রকম থেকে যায়।

প্রিয় মানুষ স্মৃতি সম্পর্ক অতীত অনুভূতি নস্টালজিয়া মায়া বিরহ ভালোবাসা পুরোনো সম্পর্ক জীবনের গল্প মন অপ্রকাশিত অনুভূতি দেখা করার ইচ্ছে আড্ডা পুরোনো দিন স্মৃতির পাতা ভালোবাসার অনুভূতি

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!