দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স একদিনে ১০০ পয়েন্টের বেশি কমে গেছে। এর ফলে সূচকের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর ৬ হাজার পয়েন্টও ভেঙে পড়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট গুজব বা একক ঘটনার কারণে এ দরপতন হয়নি। বরং অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত প্রত্যাশার সংশোধন মিলিয়ে বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
রোববার লেনদেনের শুরুতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ায় সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রথম ঘণ্টার লেনদেন শেষ হওয়ার পর বিক্রির চাপ দ্রুত বাড়তে থাকে। দিনভর এ প্রবণতা অব্যাহত থাকায় শেষ পর্যন্ত বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দেয়।
দিন শেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২০টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩৪৮টির দাম কমেছে এবং ২১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১০৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। ডিএসই-৩০ সূচক ২৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১১৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১১৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। দিন শেষে বাজারটিতে ৫৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ১৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
লেনদেনের দিক থেকে এদিন শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার ছিল শীর্ষে। কোম্পানিটির ২০ কোটি ২১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরপর মালেক স্পিনিংয়ের ২০ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের ১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২০৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০টির দাম বেড়েছে, ১৫৭টির কমেছে এবং ১৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৭১ পয়েন্ট কমেছে। দিন শেষে সিএসইতে ১৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাবে বাজারে দ্রুত উত্থান হয়েছিল। তবে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল না থাকায় এখন বাজারে সংশোধন দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নতুন আইপিও না আসা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের গতি না থাকা এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটও বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ যুক্ত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং মুনাফায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশের ওপরও পড়ছে।
বাজারে বড় পতনের আরেকটি কারণ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতির কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাজারে যখন বিক্রির চাপ বাড়ে, তখন সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা না থাকায় সূচকের পতন দ্রুত বড় আকার ধারণ করে।
জ্বালানি ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকট নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হওয়ায় বাজারের বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বেও এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসইএক্সের ৬ হাজার পয়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর ভেঙে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। তবে আজকের পতনকে বাজারের ধারাবাহিক প্রবণতা হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাজারে আস্থা সংকট থাকলেও পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!