ছবি : রয়টার্স
ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত ফ্রান্স ও স্পেন। দুই দেশেই আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীরা দিনরাত কাজ করে গেলেও নতুন তাপপ্রবাহের আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা সোমবার বলেন, দাবানল নিয়ন্ত্রণে আগামী দুই দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, বুধবার থেকে আবহাওয়া আরও প্রতিকূল হয়ে উঠতে পারে, যা আগুন নেভানোর কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলবে।
স্পেনে মাদ্রিদের আশপাশ, আভিলা, টোলেডো, ভ্যালেন্সিয়া ও কাস্তেলোনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলেই নতুন করে প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আভিলা প্রদেশে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা পরিস্থিতিকে ‘একটি দানবের বিরুদ্ধে লড়াই’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের বোর্দোর কাছে জিরোন্দ অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ৪৫টি ক্যাম্পসাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে। দাবানলে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪০টি বাড়ি পুড়ে গেছে।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফায়ারফাইটার্স ফেডারেশন জানিয়েছে, দাবানল থেকে সৃষ্টি হওয়া বিরল ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ অগ্নি-মেঘ নতুন করে প্রবল বাতাস ও বজ্রপাত তৈরি করতে পারে, যা আগুন আরও ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন। একই সময়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দাবানলকবলিত ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন।
ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলের দাবানলে এখন পর্যন্ত ৮৪ জন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ জনকে চিকিৎসার জন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দমকলকর্মীদের নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতির অভিযোগও উঠেছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে ফ্রান্সে নতুন তাপপ্রবাহ শুরু হতে পারে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে, যা আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
জিরোন্দ অঞ্চলে দাবানল মোকাবিলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ দমকলকর্মী, ১ হাজার ৫০০ সেনাসদস্য এবং ১ হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বোর্দোর কাছে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ শিল্প এলাকা রক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ দাবানলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতিকে ‘অকল্পনীয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। এদিকে পোপ লিও চতুর্থ স্পেন ও ফ্রান্সের দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এবং উদ্ধারকর্মীদের জন্য প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুধু ফ্রান্স ও স্পেন নয়, ইতালির দক্ষিণাঞ্চলও দাবানলের কবলে পড়েছে। দেশটির পুগলিয়া অঞ্চলে সমুদ্রপথে ৪০০ জনের বেশি পর্যটক ও সৈকত ভ্রমণকারীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও শত শত মানুষকে উদ্ধারের প্রস্তুতি চলছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইউরোপজুড়ে দাবানলের ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বাড়িয়ে দিয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!