যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর ২০২৬,২০ আশ্বিন ১৪৩৩

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা-ধসে নিহত ৭৫০, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৫ PM ৭১
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা-ধসে নিহত ৭৫০, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। সংগৃহীত ছবি

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকর্মীরা। তবে ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত নেপালে ৭৩৪ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল সরকার জানিয়েছে, দেশটিতে বিদেশিসহ মোট ২ হাজার ৪৯৮ জনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির হিসাবে তিব্বতে ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানানো হয়েছে।

দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েকটি টানেলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ত্রিশুলি ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে পাইপের মাধ্যমে বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে নেপালি সেনাবাহিনী। তবে রাতভর বৃষ্টি এবং নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের কাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে বরফ ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসার ঘটনায় ৯৩৩ জন শ্রমিক নিখোঁজ হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ভারত থেকে ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং চীন থেকে নয় সদস্যের একটি টানেল উদ্ধারকারী দল নেপালে পৌঁছেছে।

এদিকে নতুন করে প্রাকৃতিক হ্রদ সৃষ্টির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে তিব্বত সীমান্ত এলাকায়। সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ভূমিধসের পর সেখানে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। সেটি আগের একটি খালি হয়ে যাওয়া হ্রদ থেকে মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দূরে। নতুন এই জলাধার তৈরি হলে উদ্ধার কার্যক্রম আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তার কারণে গিরং সীমান্তবন্দর এলাকার উদ্ধারকর্মীদের ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা বিবেচনায় নেপাল সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, পুনর্গঠন কার্যক্রমে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তার পাশাপাশি ভারী সরঞ্জাম বহনে সক্ষম ড্রোন, ডিএনএ পরীক্ষার কিট এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ফ্রিজার ইউনিটও চাওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসার ফলেই এই বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসও চীন-নেপাল সীমান্তের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসের কথা জানিয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে লিরুং পর্বতের দক্ষিণ ঢালের একটি হিমবাহ ভেঙে পড়াকে ধসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল এই ঘটনাকে হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আকস্মিক হিমবাহ ধস ও বন্যা ওই অঞ্চলের জলবায়ু ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা আরও স্পষ্ট করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

রেড ক্রসের হিসাবে, নেপালে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রায় ৩৬ লাখ ডলার করে, যুক্তরাজ্য ৬৮ লাখ ডলার, জাতিসংঘ ২৫ লাখ ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আইএফআরসিও জরুরি তহবিলে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আরও অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

চীনও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। মালয়েশিয়া বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর পাশাপাশি ১০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়াদের উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এখন নেপাল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।

নেপাল তিব্বত

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!