যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬,৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

হুতিদের দখল বাড়ায় চাপে ট্রাম্প, হরমুজ-লোহিত সাগরে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৯ PM ৬০
হুতিদের দখল বাড়ায় চাপে ট্রাম্প, হরমুজ-লোহিত সাগরে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

ছবি:সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর সাম্প্রতিক অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে বাব এল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগর অঞ্চলে হুতিদের প্রভাব বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল পরিবহনে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হুতিদের এই অগ্রযাত্রার ফলে সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের ওপর সামরিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ ইরানকে চাপে রাখতে ওয়াশিংটন যে নীতি অনুসরণ করছে, তার প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পড়ছে।

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব এল-মানদেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।

এই অঞ্চলে হুতি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা হামলার সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং জাহাজের বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহারের কারণে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরেও পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে ঝুঁকি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ আরও তীব্র হতে পারে।

সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষি ও পণ্য পরিবহনের খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করাও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। হুতিদের শক্তি বৃদ্ধি এই ভারসাম্য আরও কঠিন করে তুলছে।

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো তেল রপ্তানির বিকল্প পথ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা। কোনো পাইপলাইন বা বন্দর হামলার ঝুঁকিতে পড়লে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর কিছু বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা থাকলেও সব উপসাগরীয় দেশের সক্ষমতা একই নয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দেশভেদে ভিন্ন মাত্রার চাপ তৈরি হতে পারে।

লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয়। জাহাজ চলাচল কমে গেলে মিসরের সুয়েজ খাল-নির্ভর রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলতে হলে সময় ও জ্বালানি খরচ বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের ওপর পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান চাপের কৌশল কত দিন কার্যকর রাখা সম্ভব। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

হুতিদের অগ্রগতি সেই ঝুঁকিকে আরও দৃশ্যমান করেছে। তাই সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার সমন্বিত কৌশল ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মানদেব অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, তাহলে এর অর্থনৈতিক মূল্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা উপসাগরীয় দেশগুলোকে নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকেও দিতে হতে পারে।

হুতি বাহিনী হরমুজ প্রণালি

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!