যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর ২০২৬,২০ আশ্বিন ১৪৩৩

রুশ প্রযুক্তি সহায়তায় নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৪ PM ৫১
রুশ প্রযুক্তি সহায়তায় নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ছে ইরান

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে; ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার সহায়তায় নিজস্ব সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শুরু হওয়া গোপন ‘C430L’ কর্মসূচির আওতায় রুশ বিশেষজ্ঞরা ইরানকে র‍্যামজেট প্রপালশন প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করছেন। এই প্রযুক্তি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের গতির কয়েক গুণ গতিতে উড়তে সক্ষম করতে পারে।

অনুসন্ধানে ফাঁস হওয়া রুশ চিঠিপত্র, ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য এবং সামরিক পেটেন্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্টের সমন্বয়ে এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা ইরানের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরান ইতোমধ্যে র‍্যামজেটভিত্তিক একটি প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি করে উড্ডয়ন পরীক্ষাও চালিয়েছে। রুশ প্রকৌশলীরা ওই পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থিতিশীলতা, বায়ুপ্রবেশপথ ও ইঞ্জিনের নজেল নিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থাৎ মস্কোর সহায়তা শুধু তৈরি অস্ত্র সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত রুশ সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের সামরিক বাহিনীতে কার্যকরভাবে মোতায়েন হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে কর্মসূচিটিকে বর্তমানে উন্নয়ন ও প্রযুক্তি অর্জনের পর্যায়েই দেখা হচ্ছে।

ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দেশটির হাতে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন তেহরানের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

র‍্যামজেট ইঞ্জিন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ইঞ্জিন বায়ুমণ্ডল থেকে বাতাস নিয়ে উচ্চগতিতে জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রকে দীর্ঘ সময় সুপারসনিক গতিতে চলতে সহায়তা করে। ফলে কম উচ্চতায় দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া একটি অস্ত্রকে শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য প্রতিপক্ষের হাতে তুলনামূলক কম সময় থাকতে পারে।

ইরান বহু বছর ধরেই এ ধরনের সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ২০১৬ সালে দেশটির কর্মকর্তারা সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এর দুই বছর পর ইউক্রেনে দুই ইরানি কূটনীতিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত নকশার খ-৩১এ অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান ও নথি সংগ্রহের চেষ্টার অভিযোগ ছিল।

সামুদ্রিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য গুরুত্বও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি দিয়ে উচ্চগতিতে এগিয়ে আসা সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধজাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনীর মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা বাহিনীর বিরুদ্ধে এটি ইরানের জন্য নতুন একটি সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।

তবে এই সম্ভাব্য সক্ষমতাকে এখনই বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ রুশ সহায়তায় তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের সামরিক ব্যবহারে প্রবেশ করেছে—এমন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বিশ্লেষকদের বক্তব্যেও কর্মসূচিটিকে উন্নয়ন পর্যায়ের সহযোগিতা হিসেবে দেখা হয়েছে।

ইরান শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতেই রাশিয়ার সহযোগিতা নিচ্ছে না। দেশটির বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, ইরানের জন্য সামরিক বিমান সরবরাহের একটি চুক্তি ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে ইরানে ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান পৌঁছায়। এই বিমানগুলো আধুনিক যুদ্ধবিমানের জন্য পাইলট প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সুখোই সু-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তবে নির্ধারিত যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের সামরিক বাহিনীতে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য এখনো সীমিত। ফলে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এসব যুদ্ধবিমানকে সমন্বিত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সেটিকে বর্তমান সক্ষমতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতার বড় একটি অধ্যায় তৈরি হয় ইউক্রেন যুদ্ধের পর। ২০২২ সাল থেকে ইরান রাশিয়াকে শাহেদ-১৩১ ও শাহেদ-১৩৬ ধরনের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন সরবরাহ করে। পরে রাশিয়ায় এসব ড্রোন উৎপাদনের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।

রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব ড্রোনের নেভিগেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ওয়ারহেডে বিভিন্ন পরিবর্তন আনে। এর ফলে মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সহযোগিতা শুধু অস্ত্র সরবরাহে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের দিকে এগিয়ে যায়।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানেও এই সম্পর্কের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, C430L কর্মসূচির মাধ্যমে রাশিয়া ইরানকে শুধু কোনো তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার পরিবর্তে উন্নত অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করছে।

ইরানের জন্য এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব এখানেই। র‍্যামজেট প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারলে দেশটি ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তিকে ভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের নকশায় ব্যবহার এবং পরবর্তী প্রজন্মের অস্ত্র উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবে। এতে বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তবে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ককে সরাসরি একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হিসেবে দেখার মতো তথ্য নেই। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ ২০ বছরের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করলেও এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সব কর্মসূচি একই গতিতে এগোয়নি। বিশেষ করে যুদ্ধবিমান সরবরাহের মতো কিছু বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। এর অর্থ হলো, দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ অনুযায়ী সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ করে উভয় পক্ষই এগোচ্ছে।

C430L কর্মসূচিকে সেই বৃহত্তর সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। এটি এমন এক ধরনের সহযোগিতা, যেখানে রাশিয়া ইরানকে প্রযুক্তি, প্রকৌশল দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে; কিন্তু সরাসরি রুশ বাহিনীকে সংঘাতে যুক্ত করছে না।

ইরানের সামরিক প্রযুক্তি অর্জনের পথ শুধু রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানে উচ্চক্ষমতার চীনা স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ব্যবহার এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারবা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

চীনা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক স্থাপনা পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা পাওয়ার অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছে।

এসব সম্পর্ককে একক কোনো ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোট হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং বিভিন্ন প্রয়োজন অনুযায়ী ইরান রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে আলাদা ধরনের প্রযুক্তি ও সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে।

সব মিলিয়ে C430L কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি হস্তান্তরের ধরন। রাশিয়া যদি ইরানকে র‍্যামজেট প্রযুক্তির জটিল সমস্যাগুলো সমাধানে সফলভাবে সহায়তা করতে পারে, তাহলে তেহরান ভবিষ্যতে নিজস্ব নকশায় আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ভিত্তি পেতে পারে। তবে সেই সক্ষমতা এখনই পূর্ণাঙ্গ সামরিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!