যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬,৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার পথে বাংলাদেশ

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৩ PM ৫৫
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার পথে বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি চালু হলে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর স্বীকৃতি হিসেবে কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।

বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম বড় আকারের বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি জ্বালানি উৎপাদনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার ল্যান্ডফিল থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ বিভাগ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সম্মতিতে এ চুক্তি সম্পন্ন হয়। প্রকল্প থেকে ২০২৮ সালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটিকে শুধু বিদ্যুৎ কেনার একটি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করলে এর বিস্তৃত প্রভাব ধরা পড়বে না। কারণ আমিনবাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি উৎপাদনের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। বর্তমানে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিচালনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বছরে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। চীনের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হলে এই খাতে সিটি করপোরেশনের ব্যয় থাকবে না বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাদের দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৯০ কোটি টাকার কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে কার্বন ক্রেডিটের প্রকৃত আর্থিক মূল্য নির্ধারণে প্রকল্পের নির্গমন হ্রাসের পরিমাণ, যাচাই প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, প্রকল্পটিতে চীনের সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকা। চীনের সিএমইসি গ্রুপ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এর অর্থায়নের সঙ্গে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ডিবিএস, এনডিবি এবং ব্যাংক অব চায়নাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের দাম নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত দাম ১০ টাকার নিচে দাঁড়াবে। তার মতে, এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ।

কার্বন ক্রেডিট মূলত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো বা অপসারণের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। সাধারণভাবে একটি কার্বন ক্রেডিট এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো বা অপসারণের প্রতিনিধিত্ব করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি ও নিয়মের আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে বাংলাদেশ এ ধরনের ক্রেডিটের সুবিধা নিতে পারবে।

সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে দেশের কার্বন ক্রেডিট বাড়ানোর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বন সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কার্বন শোষণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়ার পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশটি উচ্চ আর্দ্রতাসম্পন্ন বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইনসিনারেটর গ্রেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক ও কাগজ আলাদা করে জ্বালানি প্যালেট তৈরি এবং পচনশীল বর্জ্য থেকে মিথেন উৎপাদনের প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়।

পরিবেশবিদদের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কার্বন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। ল্যান্ডফিলে জৈব বর্জ্য পচনের সময় মিথেন তৈরি হয়। নিয়ন্ত্রিত ডাইজেস্টারের মাধ্যমে এই মিথেন সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা গেলে একদিকে বিকল্প জ্বালানি পাওয়া সম্ভব, অন্যদিকে ল্যান্ডফিল থেকে অনিয়ন্ত্রিত মিথেন নির্গমন কমানো যায়।

তবে কোনো প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট পেতে হলে নির্গমন হ্রাসের পরিমাণ যথাযথভাবে পরিমাপ, প্রতিবেদন এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হয়। কত পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট তৈরি হবে এবং এর আর্থিক মূল্য কত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের পদ্ধতি, যাচাই করা নির্গমন হ্রাস, ক্রেডিটের মান ও আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়মের ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, সরকার কার্বন ট্রেডিং নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবছে, যা আশাব্যঞ্জক। তার মতে, আমিনবাজারের প্রকল্প থেকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এতে কাঁচা বর্জ্য থেকে সৃষ্ট দুর্গন্ধ ও দূষণ কমানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মিথেন ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। কার্বন ট্রেডিং নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিকল্পনা এবং প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এখন এসব পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বর্জ্য কার্বন

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!