ছবি:সংগৃহীত
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নে খয়রাবাদ নদীর ভয়াবহ ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীতীর সংরক্ষণ, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে।
রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দপদপিয়া ইউনিয়ন খয়রাবাদ নদীভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও স্কুলশিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়।
কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে নদীভাঙন দীর্ঘদিনের বড় দুর্ভোগ। প্রতিবছর ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
নদীভাঙন প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তাঁর অভিযোগ, জলবায়ু তহবিলের অর্থ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানো হচ্ছে না।
খয়রাবাদ নদীর ভাঙন ঠেকাতে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ডা. মনীষা। তাঁর ভাষ্য, দেশে নদী নিয়ে গবেষণার প্রতিষ্ঠান থাকলেও এই নদীর ভাঙন মোকাবিলায় কার্যকর গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
ডা. মনীষা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের বেড়িবাঁধ ও জিও ব্যাগ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত কাজ শুরু হয়নি। তাঁর অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে এলাকাবাসী আন্দোলন করলেও নদীতীর রক্ষায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
নদীভাঙনের কারণে শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থায়ও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভোগান্তি হচ্ছে। এমনকি স্থানীয় কবরস্থানও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
ডা. মনীষা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কাজ কবে শুরু হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, আরও কত পরিবার ঘরবাড়ি হারানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেবে?
স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিকবার দাবি জানানোর পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বড় ধরনের আন্দোলনের দিকে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের এমন আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন বাসদ নেত্রী।
সরকারের প্রতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের পাশাপাশি নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী অবকাঠামো, বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় এক শতাব্দী ধরে খয়রাবাদ নদীর ভাঙনে এলাকার বসতভিটা, পৈতৃক সম্পত্তি এবং পূর্বপুরুষদের কবর বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ভরতকাঠি ও পশ্চিম বীর নারায়ণ গ্রামের ২০০টির বেশি পরিবার এবং প্রায় এক হাজার মানুষ নতুন করে বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তাঁদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে প্রায় এক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জিও ব্যাগ স্থাপন, স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এর আগে গত ৭ জুন একই দাবিতে নলছিটি উপজেলা কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। তবে প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কর্মসূচিতে দপদপিয়া ইউনিয়ন খয়রাবাদ নদীভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মো. রুহুল আমিন হাওলাদার, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ফরিদ হাওলাদার, সদস্যসচিব মো. রমজান আকন হৃদয়, যুগ্ম সদস্যসচিব মো. রুবেল হাওলাদারসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
বক্তারা দ্রুত খয়রাবাদ নদীর ভাঙন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ, নদীতীর সংরক্ষণ, বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।
ঝালকাঠি নদীভাঙন নদীভাঙন প্রতিরোধ
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!