যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬,১৮ কার্তিক ১৪৩৩

পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে তোড়জোড়, লক্ষ্য ডিসেম্বর

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২৭ PM ৫
পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে তোড়জোড়, লক্ষ্য ডিসেম্বর

সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ কমিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের পর সাভার ও আশুলিয়ার কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার চিত্র দেখা যাচ্ছে। বোর্ডের প্রথম বৈঠক শিগগিরই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতারের প্রত্যাশা, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।

সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থের পাশাপাশি শিল্পের কার্যক্রমও সচল রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিক ও শিল্প—উভয় পক্ষের জন্য বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি আয় বাড়ানো ও অর্থনীতির অগ্রগতির পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবিকা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাক কিংবা কোনো শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ুক—এমন পরিস্থিতি এড়ানোই সরকারের লক্ষ্য। তাঁর মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরার উপযুক্ত জায়গা হলো মজুরি বোর্ড। তাই উৎপাদন বন্ধ, সড়ক অবরোধ বা সংঘাতে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দাবি জানানো উচিত।

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং স্বতন্ত্র সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন। পোশাকশিল্পের বিভিন্ন গ্রেডের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করবে এই বোর্ড। পরে সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম পাওয়ার পর দ্রুত বোর্ড গঠনের কাজ শেষ করা হয়েছে। শিগগিরই এর প্রথম সভা বসবে। শ্রমিকদের দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আশা করছেন বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার। তাঁর মতে, বোর্ড পুনর্গঠনের ফলে শ্রমিকদের প্রস্তাব ও দাবিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া উচিত, তা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে একাধিক প্রস্তাব রয়েছে। কেউ ২৭ হাজার, কেউ ৩০ হাজার, কেউ ৩২ হাজার, আবার কেউ ৩৭ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, কারখানাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন ও সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সম্মিলিত প্রস্তাব তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।

বাবুল আখতার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে বোর্ডে জোরালোভাবে দাবি জানানো হবে। তবে এ প্রক্রিয়ার মধ্যে উৎপাদন সচল রাখা জরুরি। শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে। সংশোধিত মজুরি কাঠামো আগামী জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ মাসিক ন্যূনতম মজুরি ২৬০ মার্কিন ডলার করার প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্য শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও দ্রুত বোর্ডের বৈঠক আয়োজন এবং আলোচনার মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।

মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগের পর সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবার বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করে কাজে যোগ দিতে দেখা যায়। শ্রমিকনেতারাও নতুন বোর্ডের মাধ্যমে দাবি আদায়ের আশ্বাস দিয়ে কর্মস্থলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিজয়নগরের শ্রম ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বাবুল আখতার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে তাঁদের প্রতিনিধিরা বোর্ডে কাজ করবেন। এ সময় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে যাওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণের বদলে তাঁদের কর্মসংস্থানই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আখতারও শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থা শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায় বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও কারখানায় ভাঙচুরের সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আন্দোলনের নামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোনো নিরপরাধ শ্রমিক বা শ্রমিকনেতা গ্রেপ্তার হয়ে থাকলে তাঁদের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন তিনি। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানান।

শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান এবং পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানানো হয়েছে।

এর আগে সোমবার সকালে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেতা শিমুল বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নতুন মজুরি বোর্ড

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!