ছবি:সংগৃহীত
শত বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়নের দেখা মেলেনি সিলেট-আখাউড়া রেলপথে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত প্রায় ২৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ এখনো একক লাইনেই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ট্রেনের ক্রসিং, ধীরগতি, শিডিউল বিপর্যয় ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন যাত্রীরা।
দীর্ঘদিন ধরে এই রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন সিলেট বিভাগের বাসিন্দারা। সম্প্রতি সরকার মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে স্থানীয়দের বক্তব্য, শুধু ডুয়েলগেজ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; প্রয়োজন ডাবল লাইন।
সিলেট-আখাউড়া রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে মূলত পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে এই রেলপথ স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনেও রেলপথটির গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
বর্তমানে সিলেট অঞ্চলের মানুষের ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অংশে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম এই রেলপথ। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত বড় ধরনের উন্নয়ন না হওয়ায় রেলসিলেট-আখাউড়া রেলপথের বিভিন্ন অংশে পুরোনো অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রেললাইনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নিয়মিত সংস্কারের প্রয়োজন দেখাসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে যাত্রীদের মধ্যে।
সিলেট-আখাউড়া রেলপথের বিভিন্ন অংশে পুরোনো অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রেললাইনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নিয়মিত সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। কোথাও কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগও রয়েছে।
একক লাইন হওয়ায় দুটি ট্রেনের মুখোমুখি চলাচলের সুযোগ নেই। ফলে একটি ট্রেনকে অন্যটির জন্য স্টেশনে বা নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করতে হয়। এতে যাত্রার সময় বেড়ে যায় এবং কোনো একটি স্থানে সমস্যা হলে পুরো রুটের ট্রেন চলাচলে প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে পাহাড়ি অংশে ধীরগতিতে ট্রেন চলাচল এবং ক্রসিংয়ের কারণে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়মিত ট্রেনযাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই রুটের দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে ডাবল লাইন নির্মাণ জরুরি।
তাদের দাবি, ডাবল লাইন হলে একই সময়ে দুই দিক থেকে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এতে ক্রসিংয়ের জন্য অপেক্ষার সময় কমবে, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে এবং সামগ্রিকভাবে যাত্রার সময়ও কমানো যাবে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রেলসেবার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রী বাধ্য হয়ে সড়কপথে যাতায়াত করছেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে সিলেট-আখাউড়া রেলপথকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হলে নতুন ট্রেন সংযোজনের সুযোগ তৈরি হবে এবং ভিন্ন ধরনের রেলগেজের ট্রেন চলাচল করতে পারবে।
তবে ডাবল লাইন নিয়ে স্থানীয়দের দাবির বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
রেলযাত্রীদের একটি অংশ মনে করছেন, ডুয়েলগেজ করা হলেও একক লাইনের মূল সমস্যা থেকে যাবে। তাদের যুক্তি, ডুয়েলগেজ মূলত একই লাইনে বিভিন্ন গেজের ট্রেন চলাচলের সুবিধা তৈরি করবে; কিন্তু ক্রসিংয়ের কারণে ট্রেনকে অপেক্ষা করার বিষয়টি পুরোপুরি দূর হবে না।
তাই রেলপথের নিরাপত্তা, ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত যাতায়াত এবং সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে ডাবল লাইন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন তারা।
বর্তমানে সিলেট থেকে ঢাকায় ট্রেনে যেতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। যাত্রীদের প্রত্যাশা, আধুনিক ও ডাবল রেললাইন নির্মাণ করা হলে এই রুটে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
সিলেট-আখাউড়া রেলপথ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো অবকাঠামোর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাপ সামলাতে রুটটির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরকারের ডুয়েলগেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেল যোগাযোগে কিছুটা সক্ষমতা বাড়বে। তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করছে শেষ পর্যন্ত রেলপথটি ডাবল লাইনে উন্নীত করার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
সিলেট রেল যোগাযোগ রেলপথ আধুনিকায়ন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!