যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬,৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

অর্থনীতির আগাম সংকেত দেবে পিএমআই

কাজে আসবে নীতিনির্ধারণেও

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৪ PM ৫৩
অর্থনীতির আগাম সংকেত দেবে পিএমআই

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ছে নাকি কমছে, মূল্য ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই ধারণা দিতে পারে পারচেজিং ম্যানেজারস’ ইনডেক্স বা পিএমআই। দ্রুত প্রকাশযোগ্য এই সূচক অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে ‘আর্লি-ওয়ার্নিং’ বা আগাম সংকেত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) কার্যালয়ে পিএমআই নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত একটি প্রেজেন্টেশনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এমসিসিআই ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।

সেমিনারে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডাম অ্যাস্পডেন, এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহাম্মাদ এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র ম্যানেজার হাসনাত আলম উপস্থিত ছিলেন।

পিএমআই মূলত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের পরিবর্তন পরিমাপের একটি সূচক। নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কাঁচামালের দাম, সরবরাহের সময়, মজুত, অসম্পন্ন অর্ডার এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রত্যাশার মতো বিষয় নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এটি তৈরি করা হয়।

জরিপে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মাসের তুলনায় তাদের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি উন্নত, অপরিবর্তিত নাকি খারাপ হয়েছে—তা জানায়। সাধারণভাবে ৫০-এর বেশি পিএমআই ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচের স্কোর সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়।

পিএমআইয়ের বড় সুবিধা হলো এটি তুলনামূলক দ্রুত প্রকাশিত হয়। জিডিপি, শিল্প উৎপাদন বা কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সরকারি পরিসংখ্যান তৈরি ও প্রকাশে সময় লাগলেও পিএমআইয়ের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ব্যবসা খাতের পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পিএমআই তথ্যেও অর্থনীতির বিভিন্ন সংকট ও পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন, কারফিউ এবং দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকার প্রভাবে আগের মাসের তুলনায় পিএমআই ২৭ পয়েন্ট কমে ৩৬ দশমিক ৯-এ নেমে যায়। অর্থাৎ ওই সময়ে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য সংকোচনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল সময়ে দীর্ঘ সরকারি ছুটি, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসংক্রান্ত চাপ ও জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতার প্রভাবে সূচক ৮ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে যায়। একই বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিনিয়োগ স্থগিত রাখার প্রভাবে পিএমআই ৭ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমেছিল।

২০২৬ সালের মে থেকে জুনেও সূচকে পতন দেখা যায়। দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু, ঈদের আগে চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন ১৫ শতাংশ ভ্যাটের প্রভাবে পিএমআই ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৫২ দশমিক ৯-এ দাঁড়ায়। তবে ৫০-এর ওপরে থাকায় ওই সময়েও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের ইঙ্গিত ছিল।

বাংলাদেশের পিএমআই তৈরিতে প্রতি মাসে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—এই চার খাতের মোট ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ করা হয়। এর মধ্যে কৃষি খাতের ৪৬টি, উৎপাদনের ৯২টি, নির্মাণের ৫০টি এবং সেবা খাতের ২১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এতে ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশাও উঠে আসে। ফলে অর্থনীতির চাহিদা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পিএমআই ও প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোজোনের ক্ষেত্রে পিএমআইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ জিডিপি অনুমানের সম্পর্ক ৮২ শতাংশ পর্যন্ত এবং মহামারির আগের সময়ে ত্রৈমাসিক পিএমআই ও প্রথম জিডিপি অনুমানের সম্পর্ক ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত ছিল বলে প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়।

এর ফলে সরকারি অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের আগেই অর্থনীতির সম্ভাব্য গতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পিএমআই ব্যবহার করা যেতে পারে।

পিএমআইয়ের বিভিন্ন উপসূচক অর্থনীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতেও সহায়ক হতে পারে। নতুন অর্ডার, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধারাবাহিক দুর্বলতা দেখা দিলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্ভাব্য মন্দার ইঙ্গিত দিতে পারে। বিপরীতে নতুন অর্ডার ও উৎপাদন বাড়লে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা বোঝা যেতে পারে।

একইভাবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের তথ্য ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির চাপ সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে পারে। এসব তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে আরও তথ্যনির্ভর করতে সহায়তা করতে পারে।

পিএমআই শুধু সরকারি নীতিনির্ধারণের জন্য নয়, বেসরকারি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ব্যবহারযোগ্য। উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, সরবরাহকারী নির্বাচন, ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানগুলো এ সূচক থেকে ধারণা নিতে পারে।

এ ছাড়া শেয়ার ও বন্ডবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং পণ্যবাজারের প্রবণতা বিশ্লেষণেও পিএমআই সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে জানতে খাতভিত্তিক পিএমআইয়ের পরিধি বাড়ানোর ওপর সেমিনারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতের জন্য আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থা সূচকের সঙ্গে পিএমআইয়ের তথ্য সমন্বয় করা গেলে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা—দুই দিকেরই তুলনামূলক পরিষ্কার চিত্র পাওয়া সম্ভব বলে প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়।

সেমিনারে অর্থনৈতিক তথ্যের সময়ানুবর্তিতা, প্রাপ্যতা ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিত ও দ্রুত জরিপের মাধ্যমে অর্থনীতিতে পরিবর্তনের আগাম সংকেত পাওয়া গেলে নীতিনির্ধারকেরা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন।

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে পিএমআই নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশের মতো পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতেও এ সূচকের তথ্যের পরিধি ও মান বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হতে পারে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!