ছবি : সবুজ নিশান
বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা, যা প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এবং কৃষি ও মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যে ভরপুর। কিন্তু মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নির্বিঘ্ন ও দ্রুত যোগাযোগের অভাবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহু বছর ধরে পূর্ণতা পায়নি। লঞ্চ ও ফেরি-নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং নদী পারাপারের অনিশ্চয়তা এখানকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ধ্রুব বাস্তবতা। এ বাস্তবতায় ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি ভোলার লাখ লাখ মানুষের সময়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক অবকাঠামো নীতিগত বিষয়।
সম্প্রতি সরকার ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করার জন্য 'রহমতপুর-হিজলা-মেহেদিগঞ্জ-ভোলা' রুটকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। অপরদিকে, সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞ মহলে দীর্ঘদিনের মূল দাবি ছিল কালাবদর-তেঁতুলিয়া নদীর ফেরি পয়েন্ট ঘেঁষে সরাসরি 'ভোলা-বরিশাল সেতু' নির্মাণ। উভয় প্রকল্পের কারিগরি দিক, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis), এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যেটি ‘সাশ্রয়ী’ বলা হচ্ছে, অর্থনীতির পরিসংখ্যান ও গণমানুষের চাহিদার বিবেচনায় তা প্রকৃতপক্ষে কতটা সুবিধাজনক, তা গভীর পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।
দুই পথের পরিসংখ্যান ও আর্থিক হিসাব
প্রস্তাবিত দুই বিকল্পের অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও ব্যয়ের আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে সুস্পষ্ট তফাৎ ফুটে ওঠে:
১. সরাসরি ভোলা-বরিশাল সেতু (পুরাতন/সরাসরি প্রস্তাব):
• নির্মাণ ব্যয় ও বৈশিষ্ট্য: কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর দিয়ে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি হাই-লেভেল একক বড় সেতু এবং প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব। এতে প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৯,৯২২ কোটি টাকা (১.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
• অর্থনৈতিক সূচক (Feasibility Study): প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, এর অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার (EIRR) ২২.৫৪% (যা ১৫% থ্রেশহোল্ডের চেয়ে অনেক বেশি)। এর নিট বর্তমান মূল্য (NPV) দাঁড়ায় প্রায় ১৪,৩৭১ কোটি টাকা এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও (BCR) ৩.১৫ পর্যন্ত উন্নীত হয়।
• সুবিধা: এই সেতু বাস্তবায়িত হলে বরিশাল বিভাগীয় শহরের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে এবং যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার সাশ্রয় হবে।
২. রহমতপুর-হিজলা-মেহেদিগঞ্জ-ভোলা মহাসড়ক (প্রস্তাবিত নতুন রুট):
• নির্মাণ ব্যয় ও বৈশিষ্ট্য: এই রুটে ২১ কিলোমিটার নতুন হাইওয়ে নির্মাণ, ৩৬ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ এবং মেঘনা মোহনায় ৩টি বড় সেতুসহ বেশ কয়েকটি ছোট সেতু নির্মাণ করতে হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং নথিপত্র ভেদে এই বিকল্পের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রাক্কলন ১৭,৪৬৬.৩২ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ৪৬,৫১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত উল্লিখিত হয়েছে।
• অর্থনৈতিক সূচক: এই রুটের EIRR ধরা হয়েছে ১৩.১৩% এবং BCR প্রায় ১.২৭ থেকে ১.৩১। এর ENPV (Economic Net Present Value) প্রায় ১,৬৮১.১৪ কোটি টাকা।
• সীমাবদ্ধতা: একাধিক সেতু ও দীর্ঘ ঘুরপথ হওয়ার কারণে বরিশাল বিভাগীয় সদরে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ও দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে।
লাভ-ক্ষতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বিচার্য বিষয় সরাসরি ভোলা-বরিশাল সেতু রহমতপুর-হিজলা-মেহেদিগঞ্জ-ভোলা রুট
প্রাথমিক আনুমানিক ব্যয় ~৯,৯২২ কোটি টাকা ~১৭,৪৬৬.৩২ থেকে ৪৬,৫১৫ কোটি টাকা (নথিভেদে)
অবকাঠামোগত জটিলতা ১টি প্রধান নদী অতিক্রমকারী সেতু (৩.৫ কিমি) ৩টি বড় সেতু + একাধিক ছোট সেতু + দীর্ঘ হাইওয়ে
দূরত্ব ও সময় সাশ্রয় দূরত্ব সবচেয়ে কম, দ্রুত বরিশাল সদরে পৌঁছানো সম্ভব ঘুরপথ; সময় ও জ্বালানি খরচ বেশি
অর্থনৈতিক রিটার্ন (EIRR / BCR) EIRR: ২২.৫৪%, BCR: ৩.১৫ (উচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্ন) EIRR: ১৩.১৩%, BCR: ১.২৭ (মাঝারি রিটার্ন)
দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রীভূত রক্ষণাবেক্ষণ (একটি মূল অবকাঠামো) দীর্ঘ সড়ক ও একাধিক ব্রিজের বার্ষিক বড় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়
ভোলার জনমানুষ ও আঞ্চলিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ
ভোলার কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মূল চাওয়া—পচনশীল পণ্য (যেমন মাছ, শাকসবজি ও দুধ) কত দ্রুত এবং কম খরচে বড় বাজারগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব।
সরাসরি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মিত হলে দ্বীপটির অর্থনীতি সরাসরি বিভাগীয় শহর বরিশালের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এর ফলে বরিশাল থেকে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামমুখী অর্থনৈতিক করিডোরে ভোলার অন্তর্ভুক্তিতে সময় সাশ্রয় হবে সবচেয়ে বেশি। দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং উৎপাদক পর্যায়ে সঠিক মূল্য পাওয়া নিশ্চিত হবে।
অপরদিকে, নতুন ঘুরপথটি হিজলা ও মেহেদিগঞ্জের মতো মধ্যবর্তী উপজেলাগুলোকে সড়ক যোগাযোগের আওতায় আনলেও ভোলার মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সাথে বরিশাল শহরের দূরত্ব বাড়িয়ে দেবে। দীর্ঘ রুটে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় এবং যান চলাচলের সময় বৃদ্ধির কারণে ভোলার ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
এছাড়াও, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি সেতুর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মুমূর্ষু রোগীকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে নতুন ঘুরপথের চেয়ে সরাসরি সেতু সময় বাঁচাবে, যা বহু জীবন রক্ষার নিয়ামক হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও 'সাশ্রয়ী' ধারণার পুনর্বিবেচনা
সরকারি নীতি-নির্ধারণে রহমতপুর-হিজলা-মেহেদিগঞ্জ-ভোলা রুটকে "সাশ্রয়ী ও কার্যকর" হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ব্যয়ের দিকটি উপেক্ষা করা যায় না।
মেঘনার মতো উত্তাল নদী মোহনায় ৩টি বড় সেতু এবং উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বিস্তৃত নতুন ও পুনর্নির্মিত সড়ক ব্যবস্থার বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রতি বছর এই সড়ক অবকাঠামো সংস্কারের বিপুল পরিচালনা ব্যয় শেষ পর্যন্ত টোল এবং করদাতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, একটি সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী হাই-লেভেল একক সেতু নির্মাণ প্রাথমিক টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রীভূত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল ও টেকসই হয়।
অর্থনৈতিক মূল্যায়নে যে প্রকল্পের Net Present Value (NPV) ১৪,৩৭১ কোটি টাকা এবং EIRR ২২.৫৪%, সেই সরাসরি সেতুকে পেছনে ফেলে ১৩.১৩% EIRR-এর একটি দীর্ঘ রুটকে চূড়ান্ত করা অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে নীতিগত অগ্রাধিকারের অসামঞ্জস্যতাকে নির্দেশ করে।
সুপারিশ ও সমন্বিত পথ
ভোলার জনগণের চাহিদা এবং অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির পরিসংখ্যান বিবেচনায় এনে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. সরাসরি সেতুকে মূল করিডোর ঘোষণা: ভোলার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মুক্তি এবং বিভাগীয় সদরের সঙ্গে দ্রুত সংযোগের স্বার্থে সরাসরি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণকেই প্রধান ও অগ্রাধিকারমূলক করিডোর হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
২. আঞ্চলিক সংযোগের সুষম বণ্টন: হিজলা ও মেহেদিগঞ্জের মতো অনুন্নত এলাকাগুলোকে সড়ক নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনাটি পর্যায়ক্রমে মূল আঞ্চলিক উন্নয়ন বাজেটের অধীনে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, তবে তাকে ভোলার মূল সংযোগের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো সমীচীন নয়।
৩. গ্যাস ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মেলবন্ধন: ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস মূল ভূখণ্ডে শিল্প সংযোগে ব্যবহারে সরাসরি সেতুর সঙ্গে সমন্বিত পাইপলাইন বা সার্ভিস লাইন অন্তর্ভুক্ত করা গেলে রূপান্তরমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
ভোলা-বরিশাল সংযোগ কেবল ইটের ওপর ইট সাজিয়ে সড়ক বা সেতু বানানোর কোনো সাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট নয়; এটি পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাব্য অনুঘটক।
পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার স্পষ্ট বার্তা—সরাসরি ভোলা-বরিশাল সেতুই অর্থনৈতিক রিটার্ন, সময় সাশ্রয় এবং জনকল্যাণের বিচারে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে লাভজনক সমাধান। স্বল্পমেয়াদি সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই লাভ এবং ভোলার লাখো মানুষের মৌলিক যোগাযোগ চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।
মো. সাকিল তালুকদার
লেখক, গবেষক, কলামিস্ট, মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক প্রভাষক, সিইউবি।
ভোলা বরিশাল রুট সেতু উন্নয়ননীতি যোগাযোগ
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!