যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ২০২৬,১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

অর্থনৈতিক আর্তনাদ: জুলাই আন্দোলনের নেপথ্য কারিগর

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৫ PM

১৩১
অর্থনৈতিক আর্তনাদ: জুলাই আন্দোলনের নেপথ্য কারিগর

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল ছাত্র আন্দোলন মনে হলেও, এর গভীরে প্রোথিত ছিল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক আর্তনাদ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিকভাবে সাধারণ মানুষকে একত্রিত করা। ৩৬৪ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত ‘Political Strategy and Mobilization: A Study of BNP's Role in the 2024 Mass Uprising’ শীর্ষক গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই গণঅভ্যুত্থানের একটি গভীর ও কাঠামোগত বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে।

গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এই অভ্যুত্থানে বিএনপির অবদান ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশই সরাসরি বিএনপির সমর্থক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, দলটির তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীবাহিনী আন্দোলনের মাঠ পর্যায়ে রাজপথ দখলে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। বিএনপির কৌশল ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ; সরাসরি দলীয় ব্যানারের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে মিশে গিয়ে তারা আন্দোলনকে একটি ‘দলীয় লেবেল’ থেকে মুক্ত রেখে ‘গণআন্দোলনে’ রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে।

এই গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক ছিল না, বরং এর সামাজিক ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে। জরিপকৃত অংশগ্রহণকারীদের ৯৪.২ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ নিম্নবিত্ত এবং ৫২.২ শতাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত, যেখানে উচ্চবিত্তের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৫.৮ শতাংশ।

আর্থিক সংগতির দিক থেকে দেখা যায়, ৮৩.৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর পারিবারিক মাসিক আয় ১,০০,০০০ টাকার নিচে। এর মধ্যে ২৬.৪ শতাংশের আয় ২৫,০০০-৫০,০০০ টাকা এবং ৫৭.১ শতাংশের আয় ৫০,০০০-১,০০,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বর্তমানের লাগামহীন মূল্যস্ফীতির বাজারে এই আয় দিয়ে সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে জীবন ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামা নির্দেশ করে যে, অর্থনৈতিক বঞ্চনাই ছিল আন্দোলনের প্রধান কাঠামোগত উপাদান।

পরিসংখ্যানগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের পারিবারিক আয়ের সঙ্গে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের (Socio-economic status) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী পজিটিভ কো-রিলেশন রয়েছে (r=.750, p<.01)। এর অর্থ হলো, আয় কমে যাওয়া সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক মর্যাদা সরাসরি প্রভাবিত করেছে।

অন্যদিকে, অংশগ্রহণকারীদের পেশাগত ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা অসংগঠিত পেশা যেমনঃ উদ্যোক্তা (১৯.৫%), শিক্ষক (১২.১%), রাইডার (১২.৪%) এবং হকার বা ড্রাইভারের মতো পেশায় যুক্ত ছিলেন, তারাই বেশি রাজপথে সরব ছিলেন। পেশার ধরনের সাথে আয়ের শক্তিশালী নেতিবাচক সম্পর্ক (r=−.644, p<.01) ইঙ্গিত করে যে, নির্দিষ্ট পেশাগত কাঠামোয় থাকা ব্যক্তিরাই তুলনামূলক বেশি আর্থিক চাপে ছিলেন, যা তাদের রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের ৬৭.২ শতাংশই বিবাহিত। অর্থাৎ, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষগুলো কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের নিরাপত্তার চিন্তায় মরিয়া ছিলেন। বয়সের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি বড় অংশ (২১.৪%) ৩০ বছর বয়সী তরুণ। এই তরুণ ও দায়িত্বশীল অংশটিই রাজপথের লড়াইকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছে।

উপসংহার

গবেষণার এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় যে, ২০২৪ সালের বিজয় কেবল একটি আকস্মিক রাজনৈতিক রদবদল ছিল না। এটি ছিল বিএনপির রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত হবার ফল এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাঁচার লড়াইয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের অর্থনৈতিক স্থিতি ও মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই রাজপথ হয়ে ওঠে কণ্ঠ প্রকাশের একমাত্র কার্যকর মাধ্যম। জুলাই-আগস্ট আন্দোলন সেই ঐতিহাসিক সত্যেরই প্রতিফলন।

লেখক: মাহাদী-উল-মোর্শেদ, গবেষক, পলিসি এনালিস্ট ও

সহ-সভাপতি, বরিশাল জেলা ছাত্রদল।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!