যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ২০২৬,১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঘর যখন ভয়ের জায়গা: টক্সিক পেরেন্টিং থেকে মুক্তির পথ

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৯ PM

৮৬
ঘর যখন ভয়ের জায়গা: টক্সিক পেরেন্টিং থেকে মুক্তির পথ

বাবা-মা হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি। প্রতিটি সন্তানই চায় তার মা-বাবার কাছে নিরাপদ থাকতে, মনের কথা খুলে বলতে। কিন্তু অনেক সময় এই পরম মমতার সম্পর্কটিই তিক্ত হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘টক্সিক পেরেন্টিং’ বা বিষাক্ত অভিভাবকত্ব। যখন বাবা-মায়ের আচরণ সন্তানের মনে সুখ বা নিরাপত্তার বদলে ভয়, অস্থিরতা এবং হীনম্মন্যতা তৈরি করে, তখনই তাকে টক্সিক বা বিষাক্ত বলা হয়। এটি কোনো একদিনের রাগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি চর্চা যা শিশুর মানসিকতাকে তিল তিল করে ধ্বংস করে দেয়। 

টক্সিক অভিভাবকের আচরণ কেমন হয়? একজন টক্সিক অভিভাবক সাধারণত সন্তানকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সম্মান করতে পারেন না। তাদের মধ্যে কিছু বিশেষ লক্ষণ থাকে। যেমন—তারা সন্তানের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। কার সাথে কথা বলবে, কী পড়বে, কোথায় যাবে—সবকিছুতেই তাদের কঠোর হুকুম থাকে। তারা প্রায়ই সন্তানের সঙ্গে অন্যের তুলনা করেন। "অমুকের ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে, তুমি কেন পারলে না?"—এ ধরনের কথা বলে সন্তানকে ছোট করেন। অনেক সময় তারা ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল’ করেন। সন্তানকে বারবার মনে করিয়ে দেন যে তার জন্য তারা কত কষ্ট করেছেন, ফলে সন্তান সারাক্ষণ এক ধরনের অপরাধবোধে ভোগে। আবার সন্তানের আবেগ বা কান্নাকে তারা ‘নাটক’ বলে উপহাস করেন, যা সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেয়।

সন্তানের ওপর এর প্রভাব কতটা গভীর? বিষাক্ত পরিবেশে বড় হওয়ার প্রভাব শুধু শৈশবে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এমন সন্তানরা বড় হয়েও সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে যে তারা হয়তো কোনো ভুল করে ফেলবে। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়। তারা নিজেদের কখনো যোগ্য মনে করতে পারে না। এর ফলে অল্প বয়সেই বিষণ্নতা (Depression) ও প্রচণ্ড দুশ্চিন্তার (Anxiety) মতো রোগ দানা বাঁধে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। যেহেতু তারা পরিবারে ভালোবাসা বা বিশ্বাসের অভাব দেখেছে, তাই বড় হয়ে তারা অন্য কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না বা সুস্থ কোনো সম্পর্কে জড়াতে ভয় পায়।

এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী? টক্সিক পেরেন্টিংয়ের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। প্রথম কাজ হলো নিজের জন্য একটি গণ্ডি বা 'বাউন্ডারি' ঠিক করা। আপনাকে বুঝতে হবে যে আপনি একজন আলাদা মানুষ এবং আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের দাম আছে। বাবা-মায়ের সব কথা বা সব শাসন যৌক্তিক নাও হতে পারে। মা-বাবার প্রতি সম্মান বজায় রেখেও নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যতটুকু দূরত্ব রাখা প্রয়োজন, তা বজায় রাখা শিখতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তগুলো নম্রভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করা উচিত।

 

পাশাপাশি নিজের মানসিক ক্ষতের যত্ন নিতে হবে। শৈশবের সেই ভয় বা কষ্টগুলো কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। মনের ভার হালকা করতে থেরাপি খুব ভালো কাজ করে। আর যারা আজ অভিভাবক, তাদের প্রতি অনুরোধ—সন্তানকে নিজের সম্পত্তি মনে না করে বন্ধু মনে করুন। শাসনের চেয়ে স্নেহের শক্তি অনেক বেশি। সন্তান ভুল করলে তাকে গালি বা মারধর না করে বুঝিয়ে বলুন। মনে রাখবেন, আজকের একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু আগামী দিনের একটি সুস্থ সমাজের কারিগর।

 

শেখ ফরিদ 

কবি ও গণমাধ্যমকর্মী

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!