যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ২০২৬,১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফল দিয়ে সৌন্দর্যচর্চা

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২২ PM

৮৮
ফল দিয়ে সৌন্দর্যচর্চা

 
জয়নাল ভাই এসেছেন যে রুমগুলো আমরা রেন্ট নেব, সেগুলোর বুকিং নিতে। টোড়ি মাসি বলল, ‘এখানে কোথায় লিখব? সব বানান ভুল। আপনি বরং নামাজ পড়ে আসেন। তারপর কথা হবে।’
এরপর সদর দরজা দিয়ে কামাল ভাই যেতে যেতে বললেন, ‘এইগুলান কেডা দিছে?’ ফুলদানিতে রাখা রজনীগন্ধা আর জারবেরা ফুলের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, ‘রঞ্জনা মাসি।’ আর মা ঘরের অন্যদিকে সিঙ্গাড়ার সামনে বসে বলল, ‘না, এগুলো দিঠি দিয়েছে।’ রাজশাহী বাসায় দিঠি আপা আমাদের উপরের তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। এটাই আমাদের সভ্যতার বিশেষ এবং অন্যতম সমস্যা। কোনো একটা প্রশ্ন করা হলো, আর সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটার সাক্ষ্য দিয়ে উদাহরণসহ উত্তর পাওয়া গেল।
এবার বলি আমার দুঃখের আর একটা কাহিনী। পেঁপে খেতে বসেছি। পেঁপে আমার অপছন্দের ফল হলেও ভারী মিষ্টি পেঁপে বলে আরাম করে খাচ্ছি। হঠাৎ করে টোড়ি মাসির চোখে পড়ে গেছি। টোড়ি মাসি বলে কী, ‘অনেক পেঁপে খেয়েছিস। এবার বাকিটুকু থ্যাঁতলা করে মুখে মেখে ফেল। সব ফল নিয়ে এটা করবি। খানিকটা খাবি, বাকিটা মুখে মাখবি। চামড়া সুন্দর হবে।’ আমি এখন সৌন্দর্যচর্চার প্রথম ধাপে মুখে পেঁপে মেখে বসে আছি।
একটু পর পর লক্ষ্য করে দেখছি মা গিয়ে আমার ফোনটা আনপ্লাগ করে দিচ্ছে। পুরো চার্জ করবার উপায় নেই। মা কোথায় যেন শুনে এসেছে যে ফোন পুরো চার্জ করতে নেই, তাতে ফোনের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। কত ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রণার মধ্যে যে বাস করতে হচ্ছে!
আজও আমার দায়িত্বে মটরশুঁটি ছোলা ছিল। আমি কিছুটা করেছি। তারপর মা এসে করুণা করে বাকিটুকু করে দিয়েছে। টোড়ি মাসি তখন ছাদে ছিল। কাজের কারচুপি ধরতে পারেনি।
শেফালির গলায় আজ গান শুনেছি। রান্না করতে করতে গাইছিল। আমাদের বাড়ির পাগলা গারদ পরিস্থিতিতেও কারও গলায় যে গান বের হচ্ছে, সে বড়ই আশার কথা।
এদিকে আমি আমার এই মহাকাব্য লিখছি। লিখতে লিখতে শুনি আমেরিকা থেকে আমার ছোট বোন অশ্রুর ফোন এসেছে। শুনতে পেলাম বোন বলছে এবার পোর্টল্যান্ডের রোজ গার্ডেনে যাওয়া যাবে না। কন্সট্রাকশন চলছে। মা ঢাকায় বসে পোর্টল্যান্ডের ফুলের বাগানের জন্য অসম্ভব দুঃখ প্রকাশ করল। সব জানতে পারলাম, কেননা মা স্পিকার দিয়ে ফোনে কথা বলে। আমি যখন লিখি তখন অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে মাছ ধরার মতো করে লিখতে হয়। কেননা আমার চারপাশে বয়ে চলে ‘জীবন বহতা নদী!’ ফুল ভলিউমে টিভি চলে। কেউ জোরে জোরে ইউটিউবে গান শোনে। কীভাবে যোগব্যায়াম করতে হবে তা শোনে! কেউ তেল ছিটিয়ে ছ্যাঁতছ্যাঁত করে মাছ ভাজে। শুধু নাচ করতে পারে না তা জানে না বলে।
এবার মা এসে আমার মাথার উপরের লাইটটা নিভিয়ে দিল। আমি বললাম, ‘লাইটটা জ্বালিয়ে রাখো।’ মা খুবই নরম সুরে আমাকে বলল, ‘লিখতে লাইট লাগবে?’ 
একটা কথা শুনেছি। ‘বেশি ভালো ভালো নয়।’ এ কথার মাহাত্ম্য এখন বুঝতে পারছি। আমার রক্ত পরীক্ষা করবার দরকার ছিল। কিন্তু হয়েছে কী আমি বেশি ভালোমতো টেস্ট করবার জন্য আমার ওষুধ খাওয়ার পর চব্বিশ ঘণ্টা গ্যাপ দিয়ে টেস্ট করেছি। করতে হত বারো ঘণ্টা গ্যাপ দিয়ে। ডাক্তার সে কথাই আমাকে জানালেন।
আমি সবসময় বলি, ‘আমার বন্ধুভাগ্য খুব ভালো।’ কিন্তু এবার দেখি বলতে হবে যে, ‘আমার ডাক্তার ভাগ্যও খুব ভালো।’ আমার শরীর খুব খারাপ হওয়ায় আমি ডাক্তারকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেছিলাম। দেখি সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার আমায় ফোন করেছেন। কী করা উচিত তা বলে ডাক্তার আমাকে বললেন, ‘আমি মক্কা থেকে বলছি। হজ্জে এসেছি।’ আমি তো বাক্যহারা। অশ্রুকে এ কথা বলায় ও বলল, ‘দিদি ভাই, আমেরিকায় তুমি এমন ডাক্তার পাবা না’।
তাই আজ আবার গেলাম টেস্ট করতে। মা বলল, ‘বাটারফ্লাই নিডল দেবেন।’ যিনি রক্ত নিচ্ছিলেন তিনি বললেন, ‘আজকাল সব পেশেন্টকেই আমরা বাটারফ্লাই নিডল দিই।’ মা বলল, ‘তবে তো বেশ ভালো।’
বারবার বাটারফ্লাই শব্দটি শুনতে আমার মন্দ লাগল না। আমার ফেলে আসা বাগানের মনার্ক প্রজাপতির কথা মনে হলো। 
সেদিন টোড়ি মাসির সঙ্গে গল্প করছি। টোড়ি মাসি কিছুক্ষণ গল্প করে হঠাৎ থেমে গেল। বলল, ‘নাহ, তোকে আর বলব না। তুই সব কথা লিখে ফেলিস।’
কথা সত্যি। কিন্তু গল্প—গুজব না করে বাঁচব কীভাবে?
পেটে বোমা মেরেও আর কোনো কথা টোড়ি মাসির কাছ থেকে পাওয়া গেল না। পরনিন্দা পরচর্চার এখানেই ইতি।
পিয়াশ মেসো এখন আমেরিকায় গেছেন ছোট মেয়ে রুমকির কাছে। ভিডিও কলে দেখলাম মেসো ওদের জন্য রান্না করেছেন। অমলেট করে ডিমের ঝোল। এ আমার ভীষণ প্রিয় একটা ডিশ। আর রান্না করেছেন কর্নিশ হেনের মাংস। দেখতে খুবই ভালো হয়েছে। টোড়ি মাসি তা দেখে বলল, ‘দেখতে তো খুব ভালো হয়েছে। এখন লবণ ঠিক হলেই খাওয়া যাবে।’

 

 


আরও যোগ করল, ‘মেয়েরা এত রান্না করে। কেউ টু শব্দটা করে না। আর ছেলেরা কিছু করলেই প্রশংসার জলোচ্ছ্বাস!’
খোলামনে ভালো বলতে বাঙালি খুবই কৃপণ। এত আর আমেরিকার ‘হানি’ ‘হানি’ ডাকের বাংলা ‘মধু’ ‘মধু’ নয়! কিন্তু এবার একটা কথা বলে মেসো একদম আটলান্টিকে ঝাঁপ মেরেছেন। মেসো বললেন কী, ‘ওদের কোনো রান্না ছিল না, তাই রান্না করলাম।’ রুমকি এ কথায় খুবই অপমানিত হয়েছে। মেসো ব্যাপারটা একটু মসৃণ করবার জন্য আরও কিছু কথা বলতে শুরু করলেন। টোড়ি মাসি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আর একটা কথাও বলো না। যত বলবে তত আরও মেখে যাবে।’
না, মেসো কোনো রবীন্দ্রসংগীত গাননি।
গত কয়েক দিন আগে আমি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার ওষুধগুলো খাওয়ার সাইড ইফেক্ট। ফলে এখন আমার সব স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমি ছাদে বা কোথাও গেলে সঙ্গে কামাল ভাই, শেফালি বা টোড়ি মাসি যায়। ‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’ 
আমার মন ভালো করতে শেফালি আমার জন্য লুকিয়ে দুটো সন্দেশ রেখেছিল। এতই যত্নে যে তা দিতেই ভুলে গিয়েছিল। আজ বের করে দেখে সন্দেশ নষ্ট হয়ে গেছে। আহা, আমার শখের সন্দেশ! শেষমেশ তার ট্র্যাশবিনে স্থান হলো!
আমি আজও একটু মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম বলে ‘আনন্দ উদ্ধার কমিটিতে’ আর একজন যুক্ত ‘হয়েছেন’। ‘মা’। মা-কে কে সামলায় তার ঠিক নেই, কিন্তু দেখি অ্যান্টাসিড আর একটা ঠাকুর পূজা দেওয়ার ঘন্টি নিয়ে মা এসে হাজির। অনেক সাধাসাধি করল অ্যান্টাসিড খাওয়ার জন্য। আমার মনে পড়ল খড়্গপুরের ক্যালপল ওষুধের কথা। কিছু হলেই আমাদের বিসিরাও হসপিটাল থেকে ক্যালপল দিত। আমরা বলতাম, ‘ঈধষঢ়ড়ষ পধঢ়ং রঃ ধষষ!’ যথারীতি আমি অ্যান্টাসিড খেলাম না। তা নিয়ে কিছুক্ষণ উচ্চস্বরে প্রেমালাপ চলল! আমি ঋজঈঝ ডাক্তারদেরই বেশি বিশ্বাস করি না, তার ওপর হাতুড়ে ডাক্তার!
আর পূজার ঘন্টির কাজ হলো যদি কাউকে ডাকতে চাই। সব দরজা খুলে ঘুমাতে হবে এখন থেকে ইত্যাদি।
টোড়ি মাসি বলছে কাল আমি অনেক আলুপুরি, সিঙারা এসব খেয়ে পেট ভরিয়ে রাতে ভাত খাইনি। সেজন্যই এমন হয়েছে। এখন থেকে বাড়িতে সিঙারা, আলুপুরি আসা বন্ধ। 
আজ কমলালেবুর খোসা ফেলতে গেছি রান্নাঘরে। কামাল ভাই আর শেফালি হাইমাই করে ছুটে এসেছে। ‘না না, এগুলো আপনার কাজ না। আমরা থাকতে আপনি কেন কমলালেবুর খোসা ফেলবেন?’ সত্যিই তো। আমি তো ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে থাকি! 
আজ এ বাসায় তৃতীয় বারের মতো মটরশুঁটির খোসা ছাড়ালাম।এত মটরশুঁটি কোথায় যাচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি শুধু দেখেছি আলু, বাঁধাকপির ঘন্ট-তে মটরশুঁটি দেওয়া হয়েছে। যত মটরশুঁটির খোসা ছাড়িয়েছি তা দিয়ে অন্তত তিনবার মটরশুঁটির কচুরি বানানো যেত। আমি অবশ্য তথ্যটা গোপনই রেখেছি যে আমি মটরশুঁটির কচুরি বানাতে পারি। কে বলতে পারে কখন কাজটা আমার ঘাড়ে পড়ে যায়।
কামাল ভাই তার ভোটের দায়িত্ব সেরে ফেরত এসেছেন। ওনার অধীনে তিনটা সিএনজি ছিল। কামাল ভাইয়ের কাজ ছিল ভোটারদের অনুনয় বিনয় করে ভোট কেন্দ্রে ওই সিএনজি করে নিয়ে যাওয়া আর তারপর ভোট দেওয়া শেষে আবার তাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। কামাল ভাই ছবি দেখালেন। কী দুরবস্থা! ভোটের পর, সারাদিনের খাটনি শেষে সংশ্লিষ্ট সবাই অবশ্য মোরগ পোলাও খেতে পেয়েছে।
এদিকে বাজার এসেছে। সবকিছুর দাম এত বেড়ে গেছে! আজ বাজারের যা পরিস্থিতি তা লিখতে চাই। 
পেয়ারা ৩০ টাকা ১/২ কেজি
বরই ৯০ টাকা ১ কেজি
পেঁপে ১৪০ টাকা ১ কেজি
কলা ৬০ টাকা ১ ডজন
ডাব ১০০ টাকা ১টা
আনারস ৫৫ টাকা ১টা
আঙুর ২০০ টাকা ১/২ কেজি
কপি ৬০ টাকা ১টা
লাউ ৯০ টাকা ১টা
কুমড়া ৬০ টাকা ১ কেজি
মিষ্টি আলু ১৬০ টাকা ২ কেজি
আর টমেটোর জায়গায় দোকানদার লিখে পাঠিয়েছেন টমেটো ৫০ টাকা ১/২ কেজি ‘টমেটো’ দিয়ে টোড়ি মাসি বেশ ভালো টক বানিয়েছে। কয়েকটা বরই-ও ছেড়ে দিয়েছে তাতে। আগে জানতাম সরস্বতী পূজার আগে বরই খাওয়া যায় না। কিন্তু টোড়ি মাসি বলল এখন আমাদের কারও কোনো রকম পড়াশোনা নেই। আর শেফালি আর কামাল ভাই ছাড়া বাকি সবাই বেকার। তাই বড়ই খাওয়া চলবে। আমরাও তাঁর রায় অমান্য করতে পারলাম না।
(ধারাবাহিক)

লেখক : সাহিত্যিক, সাবেক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং স্পেশালিস্ট (যুক্তরাষ্ট্র)

প্যানেল/মো.

 

 

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!