নানি সুলতানা বেগমের কোলে আট বছরের শিশু আয়াত। ছবি: সংগৃহীত
ঘোড়াঘাট উপজেলার এক ছোট্ট শিশু আয়াতের জীবন যেন থমকে আছে জন্মের পর থেকেই। বয়স প্রায় আট বছর হলেও শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সে এখনও অনেকটাই শিশুকালের পর্যায়ে রয়ে গেছে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, হাঁটতে পারে না, এমনকি মনের অনুভূতিও ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। চারপাশের পৃথিবীকে শুধু নীরবে দেখেই কাটছে তার দিন। পরিবারের সীমিত সামর্থ্য আর দীর্ঘদিনের চিকিৎসা সংকটের কারণে তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আয়াত দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট পৌরসভার রসুনপুর এলাকার দিনমজুর রাজু মিয়া ও আতিকা খাতুন দম্পতির মেজো সন্তান। জন্মের পর থেকেই সে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বয়স বাড়লেও তার দৈনন্দিন জীবন এখনও সম্পূর্ণভাবে পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল।
ছেলেকে ঘিরেই দিন-রাত কাটে মা আতিকা খাতুনের। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তার ভাষায়, সমবয়সী শিশুদের স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা কিংবা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা দেখলে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। তিনি বলেন, তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল সন্তান একদিন তাকে ‘মা’ বলে ডাকবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে।
আয়াতের জীবনের আরেক নির্ভরতার নাম তার নানি সুলতানা বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধা এখনও নাতিকে কোলে নিয়ে চলাফেরা করেন। ছোটবেলায় আয়াতকে বহন করা সহজ হলেও বয়স ও ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি আরও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। তবুও ভালোবাসার টানে তিনি নাতির দেখভালে কোনো ধরনের ক্লান্তি প্রকাশ করেন না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই তারা আয়াতকে একই অবস্থায় দেখে আসছেন। শিশুটির শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবারের ভোগান্তিও বাড়ছে। তাদের মতে, একটি হুইলচেয়ার পেলে আয়াতের চলাফেরা কিছুটা সহজ হবে এবং তার মা ও নানির কষ্টও অনেক কমে যাবে।
প্রতিবেশীরাও শিশুটির অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, সমবয়সী অন্য শিশুদের খেলাধুলা করতে দেখে আয়াত শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। এই দৃশ্য অনেককেই আবেগপ্রবণ করে তোলে। স্থানীয়দের আশা, সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষরা এগিয়ে এলে শিশুটির জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, জন্মগত বিভিন্ন জটিলতার কারণে অনেক শিশু এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আয়াতের ক্ষেত্রে সেরিব্রাল পালসি বা ডাউন সিনড্রোমের মতো কোনো জটিলতা থাকতে পারে। গর্ভকালীন সমস্যা, জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি কিংবা অন্যান্য শারীরিক কারণেও এমন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন সেবা শিশুর জীবনমান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল বিশ্লেষণের বাইরে আয়াতের পরিবারের চাওয়া খুবই সাধারণ। তারা বড় কোনো সহায়তা নয়, শুধু একটি হুইলচেয়ার চান। একটি হুইলচেয়ারই আয়াতের চলাফেরা সহজ করতে পারে, তাকে ঘরের বাইরে কিছুটা স্বাধীনভাবে সময় কাটানোর সুযোগ দিতে পারে এবং পরিবারের দৈনন্দিন কষ্ট অনেকটা লাঘব করতে পারে।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসনও শিশুটির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, আয়াতের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে হুইলচেয়ারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
একটি হুইলচেয়ারের অপেক্ষায় থাকা আয়াতের গল্প শুধু একটি পরিবারের সংগ্রামের কাহিনি নয়, এটি সমাজের মানবিক দায়িত্ববোধেরও একটি পরীক্ষা। সামান্য সহায়তাই হয়তো শিশুটির জীবনকে কিছুটা সহজ করে দিতে পারে এবং তার পরিবারকে দিতে পারে নতুন আশার আলো।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!