বঙ্গোপসাগরে তিন দিন ভেসে থাকার পর জীবিত উদ্ধার হওয়া জেলে আল আমিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: সংগৃহীত
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ডুবন্ত ট্রলার আঁকড়ে টানা তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে জীবিত ফিরে এসেছেন জেলে আল আমিন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও নিজের সুস্থতার চেয়ে নিখোঁজ পাঁচ সহকর্মীর নিরাপদে ফিরে আসার প্রত্যাশাই তাকে বেশি ভাবিয়ে তুলছে। তার বিশ্বাস, তারা যদি ডুবন্ত ট্রলার ছেড়ে না গিয়ে থাকেন, তবে এখনো জীবিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আল আমিন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ইচাদী গ্রামের বাসিন্দা। বুধবার বিকেলে ভোলার ঢালচর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থায় একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা তাকে উদ্ধার করেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় প্রথমে চরফ্যাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আল আমিন জানান, তারা এখনো আশা হারাননি। তার ভাষ্য, যদি নিখোঁজ জেলেরা ট্রলার ছেড়ে অন্যদিকে না গিয়ে থাকেন, তাহলে দ্রুত অনুসন্ধান চালালে তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।
আল আমিনের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই রাতে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ১১ জেলেকে নিয়ে একটি মাছ ধরার ট্রলার সাগরে মাছ ধরছিল। রাতের দিকে হঠাৎ প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে কেউ সাগরে ছিটকে পড়েন, আবার কেউ ট্রলারের ভেতরে আটকা পড়ে যান।
তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর কয়েকজন ডুবন্ত ট্রলার আঁকড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। টানা তিন দিন ও তিন রাত তারা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোদ এবং উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেন। খাবার বা বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি পান করে জীবন রক্ষার চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে দূরে একটি ডুবোচর দেখতে পেয়ে সেটিকে স্থলভাগ ভেবে সাঁতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন তারা। পরে বুঝতে পারেন সেটি নিরাপদ আশ্রয় নয়। তখন কয়েকজন আবার ট্রলারের দিকে ফিরে গেলেও আল আমিন আর ফিরে যেতে পারেননি। পরে সাগরে ভাসমান অবস্থায় অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা তাকে উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের পর আল আমিন প্রশাসনকে সম্ভাব্য একটি অবস্থানের তথ্য দিয়েছেন। তার ধারণা, নিখোঁজ জেলেরা যদি ট্রলারের কাছেই থেকে থাকেন, তাহলে তারা কাউয়ারচরের পশ্চিমে হাসাখালী এলাকার সাগরে থাকতে পারেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্ভাব্য এলাকায় উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করেছে।
আল আমিন জীবিত ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিখোঁজ জেলেদের পরিবারেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। কয়েকদিনের উৎকণ্ঠা ও শোকের মধ্যে থাকা স্বজনরা এখন উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতির অপেক্ষায় রয়েছেন এবং প্রিয়জনদের নিরাপদে ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করছেন।
গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া জেলের দেওয়া তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্ভাব্য এলাকায় যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া জেলেদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ জুলাই রাতে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে বঙ্গোপসাগরে গলাচিপার ১১ জেলেকে বহনকারী একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। পরদিন পাঁচ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তিন দিন পর আল আমিনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখনো পাঁচ জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজরা হলেন হারুন হাওলাদার, এমাদুল, ফোরকান, সায়েম ও আক্কাস। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!