যুক্তরাষ্ট্র   রবিবার ২৫ অক্টোবর ২০২৬,৯ কার্তিক ১৪৩৩

ফেলে দেওয়া কাপড়েই সৈয়দপুরে শত কোটি টাকার পোশাকের বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৮ PM | সর্বশেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১১ PM ১০০
ফেলে দেওয়া কাপড়েই সৈয়দপুরে শত কোটি টাকার পোশাকের বাজার

ছবি:সংগৃহীত

পোশাক কারখানার কাটিং থেকে বাদ পড়া কাপড়ের টুকরা বা ঝুট এখন আর শুধুই বর্জ্য নয়। এসব ফেলে দেওয়া কাপড়কে কাজে লাগিয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুরে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের ক্ষুদ্র পোশাকশিল্প। শীতবস্ত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশনেবল পোশাক তৈরি হচ্ছে এসব কারখানায়। দেশের পাশাপাশি ভারত, নেপাল ও ভুটানেও যাচ্ছে এখানকার তৈরি পোশাক।

সৈয়দপুরের এই শিল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে শত কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্পের সম্ভাবনা আরও অনেক বাড়বে।

সৈয়দপুরের রেলবাজারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ঝুট কাপড়ের ব্যবসা এখন শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। মুন্সীপাড়া, নয়াটোলা, হাতিখানা থেকে শুরু করে বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাতেও ছোট ছোট পোশাক কারখানা রয়েছে।

স্থানীয়দের হিসাবে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ৫০০টির বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছে। এর বড় একটি অংশ রয়েছে প্লাজা সুপার মার্কেট এলাকায়।

কারখানাগুলোতে সেলাই মেশিনের শব্দের সঙ্গে চলে কাপড় বাছাই, কাটিং ও পোশাক তৈরির কাজ। বড় কারখানার মতো এখানে আলাদা আলাদা ধাপে কাজ না করে অনেক কারিগর একটি পোশাকের কাটিং থেকে শুরু করে সেলাই পর্যন্ত নিজেরাই সম্পন্ন করেন।

সৈয়দপুরের তৈরি পোশাক মূলত উন্মুক্ত পাইকারি বাজারের জন্য উৎপাদন করা হয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের অর্ডারের ওপর এই শিল্পের বড় অংশ নির্ভরশীল নয়।

স্থানীয় কারিগরদের ভাষ্য, শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা সৈয়দপুরে আসেন। ঢাকা, খুলনা, যশোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পোশাক সংগ্রহ করেন।

শুধু দেশীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই এই ব্যবসা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারত, নেপাল ও ভুটানের পাইকারেরাও সৈয়দপুরে এসে ট্রাকে করে তৈরি পোশাক নিয়ে যান।

সৈয়দপুরের কারখানাগুলোতে সারা বছর একই ধরনের পোশাক তৈরি হয় না। শীত মৌসুমে জ্যাকেট, হুডি ও ব্লেজারের উৎপাদন বাড়ে। ঈদ সামনে রেখে তৈরি হয় ডেনিম ও গ্যাবাডিনের প্যান্ট, শার্টসহ নানা ধরনের পোশাক।

গরমের সময় উৎপাদনের তালিকায় যুক্ত হয় হাফ প্যান্ট, থ্রি-কোয়ার্টার, টু-কোয়ার্টার ও হালকা ট্রাউজার।

ফলে কম দামের পোশাকের বড় একটি বাজারের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য এসব পোশাক তুলনামূলক সাশ্রয়ী।

একসময় সৈয়দপুরের পোশাকশিল্প প্রায় পুরোপুরি ঝুট কাপড়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উৎপাদনে প্রায় ৬০ শতাংশ রোল কাপড় এবং ৪০ শতাংশ ঝুট কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর পেছনে অন্যতম কারণ কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। ব্যবসায়ীদের দাবি, দুই দশকের বেশি আগে যে ঝুট কাপড় কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের খরচ।

তারপরও কম দামে পোশাক বাজারজাত করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, পাইকারি পর্যায়ে একটি ফুল প্যান্ট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং একটি ভালো মানের জ্যাকেট প্রায় ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। খুচরা পর্যায়ে এসব পোশাকের দাম সাধারণত ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে থাকে।

এই শিল্পের মূল শক্তি কারিগরেরা। তবে তাঁদের কাজ যথেষ্ট শ্রমনির্ভর। ঢাকার বড় পোশাক কারখানা থেকে বস্তায় করে আসা ঝুট কাপড় প্রথমে আলাদা করতে হয়। এরপর রং, কাপড়ের ধরন ও আকার অনুযায়ী টুকরাগুলো বাছাই করে জোড়া লাগানো হয়।

একজন কারিগরের প্রতিদিনের কাজের বড় একটি অংশই চলে যায় কাপড় বাছাই ও মিলিয়ে নেওয়ার পেছনে। স্থানীয় এক কারিগরের মতে, দক্ষ একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ ৩০টির মতো পোশাকের কাটিং ও সেলাই করতে পারেন।

দিনভর কাজ করেও অনেক কারিগরের দৈনিক আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সৈয়দপুরের ক্ষুদ্র পোশাকশিল্পে অর্থের জোগান অন্যতম বড় সমস্যা। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ছোট কারখানার জন্য ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া কঠিন। ব্যবসায়িক সংকট দেখা দিলে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে অগ্রিম বা দাদন নেন।

এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সৈয়দপুরে বাড়িভিত্তিক দুই শতাধিক ক্ষুদ্র পোশাক কারখানাও গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার সঙ্গে প্রায় ৫০০ পরিবার যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তবে শিল্পটির আরও বিকাশে সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর একটি গ্যাসের সংকট। গ্যাস-সংযোগ না থাকায় সৈয়দপুরে আধুনিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট ও ডাইং কারখানা গড়ে ওঠেনি।

উদ্যোক্তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে ওয়াশিং ও উন্নত ফিনিশিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে পোশাকের মান আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে পণ্য বিক্রি এবং রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সৈয়দপুরের এই শিল্পের সঙ্গে শুধু অর্থনীতিই নয়, জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যও। স্থানীয় অনেক দরজি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পোশাক তৈরির সঙ্গে যুক্ত।

এমনই একটি পরিবারের সদস্য নওশাদ আলী ও মোহাম্মদ রুবেল। তাঁদের পরিবারে চার প্রজন্ম ধরে এই পেশা চলে আসছে। তাঁদের দাদা নাজমুল হক দেশভাগের পর এই কাজ শুরু করেন। পরে তাঁদের বাবা মোহাম্মদ চান ব্যবসার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে দুই ভাই সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

স্থানীয়দের মতে, সৈয়দপুরের পোশাকশিল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সামাজিক সম্প্রীতি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একই কর্মপরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। উৎপাদনের ব্যস্ততার মধ্যে পেশাগত পরিচয়ই এখানে বড় হয়ে ওঠে।

ঝুট কাপড়ের পুনর্ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাশ্রয়ী পোশাক সরবরাহ—সব মিলিয়ে সৈয়দপুরের এই শিল্প উত্তরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রয়োজনীয় ঋণ, গ্যাস ও আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাবনাময় খাত আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে।

বাংলাদেশ পোশাকশিল্প শত কোটি টাকার বাণিজ্য সৈয়দপুর গার্মেন্টস

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!