গল্পের আলোকে প্রতিকি ছবি ।
ঢাকার ব্যস্ত শহর। উঁচু উঁচু ভবন, যানজট, মানুষের ছুটে চলা—এই শহরেই বড় হয়েছে রিতা। ছোটবেলা থেকেই সে খুব মেধাবী। সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে মানুষের সেবা করাই ছিল তার স্বপ্ন। বহু পরিশ্রমের পর সে এখন একজন তরুণ ডাক্তার। রোগীদের সঙ্গে তার ব্যবহার এতটাই আন্তরিক যে হাসপাতালে সবাই তাকে "হাসিমুখের ডাক্তার" বলেই চেনে।
অন্যদিকে, সবুজে ঘেরা এক গ্রামের ছেলে রাহুল। ভোরের কুয়াশা, নদীর পাড় আর ধানের ক্ষেতের মাঝেই কেটেছে তার শৈশব। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক বড় কিছু করার। সে চেয়েছিল একদিন দেশের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী হতে।
স্বপ্নের টানে একদিন সে ঢাকায় চলে আসে।
শুরুটা সহজ ছিল না। ছোট্ট একটি অফিস ভাড়া নিয়ে, অল্প কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে ব্যবসা শুরু করে রাহুল। দিনের পর দিন নির্ঘুম পরিশ্রমে ধীরে ধীরে তার পথ খুলতে থাকে।
একদিন সকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিটিংয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার গাড়িতে ধাক্কা দেয়।
চারদিকে মানুষের চিৎকার।
রক্তে ভিজে যায় রাহুলের পা। প্রচণ্ড আঘাতে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
...
চোখ খুলতেই সে দেখতে পেল সাদা রঙের একটি কক্ষ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে সে।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সাদা কোট পরা এক মেয়ে।
— "কেমন লাগছে এখন?"
রাহুল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটার বড় বড় চোখ, মুখে শান্ত একটা হাসি।
— "আমি ডা. রিতা।"
রাহুল একটু হেসে বলল,
— "আপনি ডাক্তার, নাকি সিনেমার নায়িকা?"
রিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "রোগীরা সাধারণত প্রথমে ব্যথার কথা বলে। আপনি প্রশংসা দিয়ে শুরু করলেন?"
— "ব্যথা তো আছেই... কিন্তু সুন্দর জিনিস দেখলে ব্যথা একটু কমে যায়।"
রিতা মুখ গম্ভীর রাখার চেষ্টা করলেও ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
এরপর প্রতিদিনই রিতা তার ড্রেসিং করতে আসত।
কিন্তু রাহুল যেন ইচ্ছা করেই প্রশ্ন করত।
— "ডাক্তার, এত ইনজেকশন দেন কেন?"
— "কারণ আপনি কথা বেশি বলেন।"
— "তাহলে হাসির ওষুধ নেই?"
— "আছে। তবে সেটা হাসপাতালের ফার্মেসিতে বিক্রি হয় না।"
— "তাহলে আপনি একটু হাসুন।"
রিতা এবার হেসেই ফেলল।
হাসপাতালের নার্সরা একদিন মজা করে বলল,
— "ম্যাম, মনে হয় এই রোগীর সবচেয়ে বড় ওষুধ আপনি।"
রিতা লজ্জায় কিছুই বলতে পারল না।
দিন গড়াতে লাগল।
একদিন বিকেলে হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিল রাহুল।
বাইরে হালকা বৃষ্টি।
রিতা এসে বলল,
— "আজ এত চুপচাপ কেন?"
রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— "জানো, গ্রামের বৃষ্টির গন্ধটা আলাদা।"
— "আর ঢাকার?"
— "এখানে বৃষ্টির গন্ধের চেয়ে মানুষ বেশি ব্যস্ত।"
রিতা ধীরে ধীরে বলল,
— "হয়তো ঠিক মানুষটাই পেলে শহরও গ্রামের মতো আপন লাগে।"
কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সেদিন থেকেই তাদের কথাগুলো যেন আরও গভীর হতে লাগল।
রাহুল সুস্থ হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেল।
বিদায় নেওয়ার সময় সে বলল,
— "ডাক্তার, এবার তো চলে যাচ্ছি।"
রিতা হালকা হেসে বলল,
— "ভালো থাকবেন।"
রাহুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "একটা সমস্যা আছে।"
— "কী সমস্যা?"
— "পায়ের ব্যথা প্রায় ভালো হয়ে গেছে... কিন্তু হৃদয়ের ব্যথাটা শুরু হয়েছে।"
রিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
রাহুল পকেট থেকে ছোট্ট একটি কাগজ বের করল।
তাতে লেখা—
"আপনি কি আমার জীবনের স্থায়ী ডাক্তার হবেন?"
রিতা পড়ে হেসে ফেলল।
তারপর কলম নিয়ে নিচে লিখল—
"রোগী যদি সারাজীবন ওষুধ না খেয়ে শুধু আমার কথা শোনে, তাহলে ভেবে দেখা যেতে পারে।"
রাহুল মুচকি হেসে বলল,
— "ডিল!"
কয়েক মাস পর...
রাহুলের ব্যবসা সফল হতে শুরু করল। কিন্তু যত বড়ই সে হতে লাগল, ততই বুঝতে পারল—জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন টাকা নয়, পাশে থাকা একজন মানুষ।
এক ছুটির দিনে সে রিতাকে নিয়ে নিজের গ্রামে গেল।
সবুজ ধানের মাঠ, নদীর ধারে কাশফুল, সন্ধ্যার লাল আকাশ—সবকিছু দেখে রিতা মুগ্ধ হয়ে বলল,
— "এত সুন্দর একটা পৃথিবী আছে, আমি জানতামই না।"
রাহুল হেসে উত্তর দিল,
— "আর আমি জানতাম না, আমার পৃথিবীটা একদিন ঢাকার একটা হাসপাতালে সাদা অ্যাপ্রন পরে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে।"
হাওয়ায় কাশফুল দুলছিল। সূর্য ডুবছিল ধীরে ধীরে।
দুজনের হাত এক হয়ে গেল।
কেউ আর শহরের ছিল না, কেউ আর গ্রামের ছিল না।
তারা ছিল শুধু—একজন আরেকজনের।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!