সময় এগিয়ে চলছিল নিজের নিয়মে। ফিয়া আর নাসির—দুই আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়, দুই আলাদা শহর, কিন্তু একই অদ্ভুত টানে বাঁধা।
প্রতিদিন তাদের কথা হতো। কখনো পড়াশোনা, কখনো ছোটখাটো হাসি-ঠাট্টা, আবার কখনো গভীর নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতরেই দু’জনের মন আরও কাছে চলে আসছিল—যা তারা নিজেরাও পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না।
ফিয়া ছিল এমন একজন মেয়ে, যে নিজের অনুভূতিকে নাম দিতে পারত না। সে জানত নাসির তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা কি শুধুই বন্ধুত্ব, নাকি তার চেয়েও বেশি—এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিল না। সে ভাবত,“আমি কি শুধু অভ্যস্ত হয়ে গেছি নাসিরের কথায়? নাকি সত্যিই কিছু অনুভব করি?” আর নাসির… সে অনেক কিছুই বুঝত, কিন্তু সব কথা প্রকাশ করত না। সে শুধু জানত—ফিয়ার সাথে কথা না হলে তার দিন অসম্পূর্ণ লাগে। এভাবেই চলছিল তাদের সম্পর্ক, ধীরে ধীরে গভীর থেকে গভীরতর।
কিন্তু হঠাৎ একদিন সবকিছু বদলে গেল। ফিয়ার পরিবার থেকে তার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একজন পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ছেলের সাথে তার বিয়ের কথা প্রায় চূড়ান্ত। ফিয়া প্রথমে কিছু বলেনি। সে চুপ ছিল। কিন্তু সেই চুপ থাকা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। সেদিন থেকে তার ভেতরে শুরু হলো এক অদ্ভুত যুদ্ধ—যেখানে তার মন নাসিরের দিকে টানছিল, কিন্তু বাস্তবতা তাকে অন্যদিকে ঠেলে দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, কেন নাসিরের কথা শুনলে তার বুক ভারী হয়ে আসে। কেন নাসির একটু দূরে থাকলেই তার চোখ অস্থির হয়ে যায়। কেন হঠাৎ মনে হয়—“আমি কি ভুল পথে যাচ্ছি?” কিন্তু সে কখনো নিজের অনুভূতিকে পুরোপুরি নাম দিতে পারেনি।
বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যাওয়ার পর ফিয়া ভেঙে পড়তে শুরু করে, কিন্তু বাইরে থেকে সে ছিল আগের মতোই শান্ত। সবাই ভাবত, সে মেনে নিয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই রাতে, যখন ঘরটা নীরব, ফিয়া তার ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করল। হাত কাঁপছিল। সে লিখল— “নাসির…” এরপর থেমে গেল।
কিছুক্ষণ শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তারপর আবার লিখল— “আমি জানি না, এটা ভালোবাসা ছিল কি না… আমি শুধু জানি, তোমার অনুপস্থিতি আমাকে শ্বাস নিতে দেয় না।” তার চোখ ভিজে উঠল। সে লিখতে থাকল— “আমি প্রতিদিন নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি, এটা শুধু অভ্যাস। কিন্তু অভ্যাস কি মানুষকে এতটা কষ্ট দেয়?”
“আজ আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমি জানি না আমি ঠিক কী হারাতে যাচ্ছি, কিন্তু মনে হচ্ছে আমি নিজেকেই হারাচ্ছি।” সে আর লিখতে পারল না। চোখের জল কাগজ ভিজিয়ে দিল। পরের দিন সন্ধ্যায়, সে সেই চিঠিটা নাসিরকে পাঠিয়ে দিল। নাসির যখন চিঠিটা পেল, সে অনেকক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। তার সাধারণ যুক্তি, তার লজিক—সব যেন থেমে গেল। সে শুধু পড়ছিল। প্রতিটি শব্দ যেন তার ভেতর ভেঙে দিচ্ছিল কিছু একটা। সে বুঝতে পারল—ফিয়া তাকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখেনি, কিন্তু নিজেও সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। সেই রাতে নাসির প্রথমবার তার অনুভূতিকে অস্বীকার করল না। সে শুধু লিখল— “ফিয়া…” “তুই যদি এক মুহূর্তের জন্যও মনে করিস আমি তোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে তুই হারিয়ে যাস না।”
সেই দিন থেকে তাদের সম্পর্ক বদলে গেল। এটা আর শুধু বন্ধুত্ব ছিল না। এটা ছিল এমন এক অনুভূতি—যেখানে কথা না বললেও বোঝা যায়, আর দূরে থাকলেও মন কাছাকাছি থাকে। ফিয়া এখন নাসিরকে “তুমি” না বলে “তুই” বলে ডাকতে শুরু করল, যেন দূরত্ব কমে আসে। তাদের কথা এখন আরও গভীর, আরও সত্যি। কিন্তু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে—বাস্তবতা। ফিয়ার বিয়ে এখনো ঠিক। আর নাসির জানে, ভালোবাসা শুধু অনুভূতি না—এটা সময়, সিদ্ধান্ত আর সাহসও চায়। তবুও, প্রতিদিন তারা কথা বলে। কারণ তারা দুজনেই জানে— দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও, কিছু সম্পর্ক মাঝখানের দূরত্বকে অস্বীকার করতে পারে…
লেখক: ফাহামিদা খাতুন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!