যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

ঝড়ের রাত পেরিয়ে

ফাহামিদা খাতুন

ফাহামিদা খাতুন

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ PM ১৪
ঝড়ের রাত পেরিয়ে

প্রতীকী ছবি ।

সেদিন রাতটা ছিল অদ্ভুত রকমের অন্ধকার। আকাশজুড়ে কালো মেঘ, চারপাশে ঝড়ের তাণ্ডব। বাতাসের গর্জনে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন তার সমস্ত রাগ একসঙ্গে উগরে দিচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানালার কাঁচে আছড়ে পড়ছিল অবিরাম।

সুমনের বয়স তখন মাত্র দশ বছর। আর তার ছোট বোন সুজানা—সবে সাত।

সেই রাতেই তাদের ছোট্ট পৃথিবীটা চিরতরে বদলে গেল।

তাদের বাবা-মা শহর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। ঝড়ের কারণে রাস্তা ছিল ভয়ংকর পিচ্ছিল। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের গাড়িটি একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খবরটি পৌঁছে গেল তাদের বাড়িতে।

বাবা-মা আর ফিরলেন না।

সুমন তখনও বুঝতে পারেনি ‘মৃত্যু’ শব্দটির গভীরতা। সে শুধু দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, বাবা হয়তো এখনই এসে তাকে ডাকবেন—“সুমন, ভয় পেয়ো না।”

কিন্তু কেউ এল না।

সুজানা তখনও জানত না কেন সবাই কাঁদছে। সে শুধু ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল,
“ভাইয়া, মা কখন আসবে?”

সুমন কোনো উত্তর দিতে পারেনি। ছোট বোনটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে শুধু বলেছিল,
“কাঁদিস না সুজু। আমি আছি।”

সেদিন দশ বছরের একটি শিশু নিজের শৈশবকে বিদায় দিয়ে দায়িত্বের পৃথিবীতে পা রেখেছিল।

তাদের বাবা-মা কিছু সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই সম্পত্তিও তাদের রক্ষা করতে পারল না। আত্মীয়স্বজনেরা একে একে এসে সহানুভূতির কথা বলল, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিল। কিন্তু সময় গড়াতেই সেই প্রতিশ্রুতিগুলো মিলিয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পত্তির বড় অংশই আত্মীয়রা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল।

সুমন আর সুজানার জন্য রইল শুধু কয়েকটি পুরোনো জামাকাপড়, কিছু স্মৃতি আর একে অপরের হাত।

কেউ তাদের দায়িত্ব নিতে চাইল না।

কয়েকদিন পর তারা এমন এক অবস্থায় পৌঁছাল, যেখানে মাথা গোঁজার মতো একটি আশ্রয়ও তাদের ছিল না। দিনের পর দিন না খেয়ে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে একসময় তারা দুজনই দুর্বল হয়ে পড়ল।

এক বিকেলে শহরের এক নির্জন রাস্তার পাশে সুমন ও সুজানাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন এক খ্রিষ্টান ধর্মীয় সেবক—ব্রাদার মাইকেল।

তিনি তাদের দ্রুত নিজের পরিচালিত এতিমখানায় নিয়ে গেলেন।

জ্ঞান ফেরার পর সুমন প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“আমার বোন কোথায়?”

পাশের বিছানায় সুজানাকে দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

ব্রাদার মাইকেল মৃদু হেসে বললেন,
“ভয় পেয়ো না। তোমরা এখন নিরাপদ।”

সেই একটি বাক্য যেন তাদের জীবনে নতুন দরজা খুলে দিল।

এতিমখানার জীবন সহজ ছিল না। সেখানে অনেক শিশুই ছিল—কারও বাবা নেই, কারও মা নেই, কারও আবার পৃথিবীতে আপন বলতে কেউই নেই। কিন্তু সুমন ও সুজানা একে অপরের শক্তি হয়ে রইল।

সুমন ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিমান দেখলেই তার চোখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠত।

একদিন সে ব্রাদার মাইকেলকে বলল,
“আমি বড় হয়ে পাইলট হতে চাই।”

ব্রাদার মাইকেল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেন পাইলট?”

সুমন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কারণ আমি অনেক দূরে যেতে চাই। এমন একটা জায়গায়, যেখানে আমার মতো কোনো শিশু যেন নিজেকে একা মনে না করে।”

অন্যদিকে সুজানার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া।

কোনো অসুস্থ শিশু যখন এতিমখানায় অসুস্থ হয়ে পড়ত, সুজানা তার পাশে বসে থাকত। তার ছোট্ট হাত দিয়ে মাথায় পানি দিত। তখনই সে বলত,
“আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব। যেন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি।”

দুই ভাই-বোনের স্বপ্ন ছিল আকাশ আর মানুষের জীবনকে ঘিরে।

কিন্তু স্বপ্ন দেখা যত সহজ, স্বপ্ন পূরণ করা তত সহজ নয়।

দিনের পর দিন তারা পড়াশোনা করেছে। কখনো বই কেনার টাকা ছিল না। কখনো পরীক্ষার ফি জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ত। কখনো অন্যদের বিদ্রূপ শুনতে হতো—

“এতিমখানার ছেলে-মেয়ে আবার এত বড় স্বপ্ন দেখে!”

কথাগুলো তাদের কষ্ট দিত। কিন্তু ভেঙে দিতে পারেনি।

বরং প্রতিটি অপমান তাদের আরও শক্ত করে তুলেছিল।

সুমন পড়াশোনার পাশাপাশি এতিমখানার ছোটদের পড়াত। কখনো নিজের প্রয়োজনের টাকা জমিয়ে সুজানার বই কিনে দিত।

সুজানাও ভাইয়ের জন্য খাবার তুলে রাখত।

তাদের কাছে পরিবার মানে ছিল—দুজন মানুষ, যারা একে অপরকে কখনো ছেড়ে যায়নি।

সময় এগিয়ে চলল।

সুমন কলেজ শেষ করল। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সে কঠিন প্রশিক্ষণে ভর্তি হলো। সেখানে অনেক বাধা এল। অর্থের সংকট, কঠিন পরীক্ষা, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ—সবকিছু তাকে বারবার থামিয়ে দিতে চেয়েছিল।

কিন্তু সে থামেনি।

কারণ তার মনে পড়ত সেই ঝড়ের রাত।

মনে পড়ত ছোট্ট সুজানার হাত।

আর মনে পড়ত নিজের সেই কথা—
“আমি আছি।”

অন্যদিকে সুজানাও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন পড়াশোনায় নিজেকে ডুবিয়ে দিল। রাত জেগে পড়াশোনা, পরীক্ষা, ক্লান্তি—কিছুই তাকে দমাতে পারেনি।

একদিন সুমনের হাতে এল তার বহু প্রতীক্ষিত লাইসেন্স।

সে সত্যিই পাইলট হয়েছে।

সেদিন সে আকাশের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তার চোখের কোণে জল জমেছিল।

অন্যদিকে কিছুদিন পর সুজানাও ডাক্তার হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করল।

সাফল্যের সেই দিনে তারা দুজন এতিমখানায় ফিরে গেল।

ব্রাদার মাইকেল তখন অনেকটাই বৃদ্ধ।

সুমন তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ব্রাদার, আপনি সেদিন আমাদের না পেলে আজ আমরা কেউই এখানে থাকতাম না।”

ব্রাদার মাইকেল মৃদু হেসে বললেন,
“আমি শুধু তোমাদের একটি আশ্রয় দিয়েছিলাম। তোমরা নিজেরাই তোমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করেছ।”

সুজানার চোখে তখন পানি।

সে বলল,
“না ব্রাদার। আপনি আমাদের শুধু আশ্রয় দেননি। আপনি আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে, আমরা পারব।”

ব্রাদার মাইকেল কিছু বললেন না। শুধু দুজনের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় সুমন ও সুজানা এতিমখানার ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

একসময় যে আকাশ তাদের কাছে ছিল শুধুই দূরের এক স্বপ্ন, আজ সেই আকাশই সুমনের কর্মক্ষেত্র।

আর যে অসহায় শিশুটিকে একদিন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল, আজ সেই সুজানাই অসহায় মানুষের চিকিৎসা করে।

তারা জানত, তাদের বাবা-মা আজ পাশে নেই। কিন্তু তারা বিশ্বাস করত—কোথাও না কোথাও থেকে তারা নিশ্চয়ই দেখছেন।

সুমন ধীরে ধীরে বলল,
“সুজু, মনে আছে? ছোটবেলায় বলেছিলাম, একদিন আমরা বড় হব।”

সুজানা হাসল।

“হ্যাঁ ভাইয়া। কিন্তু আমরা শুধু বড় হইনি—আমরা আমাদের স্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু হয়ে গেছি।”

দূরে তখন আকাশে একটি বিমান উড়ে যাচ্ছিল।

সুমন সেটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

এক ঝড়ের রাতে যে দুটি শিশু তাদের সবকিছু হারিয়েছিল, সেই দুই শিশুই একদিন নিজেদের জীবনের ঝড় পেরিয়ে দাঁড়িয়ে গেল নিজেদের পায়ে।

তাদের গল্প প্রমাণ করে—

জীবন কখনো কখনো আমাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেয়। কিন্তু স্বপ্ন, সাহস আর ভালোবাসা যদি হৃদয়ে বেঁচে থাকে, তাহলে কোনো ঝড়ই মানুষের পথ চিরদিনের জন্য আটকে রাখতে পারে না।

কারণ কিছু মানুষ ঝড়ের কাছে হার মানে না।

তারা ঝড় পেরিয়ে নিজেরাই একদিন আলো হয়ে ওঠে।

১ মন্তব্য


Rupe nogor

Khub shundor

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১০ PM