ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১১৩ রানের ইনিংস খেলে পাকিস্তানকে রোমাঞ্চকর জয় এনে দেন শাদাব খান। ছবি: সংগৃহীত
সমালোচনা আর দলে জায়গা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন পাকিস্তানের অলরাউন্ডার শাদাব খান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে তাঁর অপরাজিত ১১৩ রানের ইনিংসে ভর করে এক উইকেটের নাটকীয় জয় পেয়েছে পাকিস্তান। ৯৬ বলের ইনিংসটি শুধু দলকে জেতায়নি, ওয়ানডে ক্রিকেটে আট নম্বর বা তার পরের অবস্থানে ব্যাট করতে নেমে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন কীর্তিও গড়েছে শাদাব।
লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে একসময় বড় পরাজয়ের আশঙ্কায় পড়ে পাকিস্তান। ২৮.৩ ওভারে সালমান আগা আউট হওয়ার সময় জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল আরও ১২০ রান। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। অধিনায়ক শাহিন আফ্রিদিও দ্রুত ফিরে গেলে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে কার্যত শেষ ভরসা হয়ে থাকেন শাদাব। একের পর এক উইকেট পড়তে থাকায় গ্যালারি থেকেও দর্শকদের অনেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করেন।
ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে খেলতে পারেননি শাদাব। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল এই আসরে তাঁর প্রথম উপস্থিতি। শুরুতে ব্যাট হাতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না তিনি। প্রথম ১৮ বলে মাত্র সাত রান করেন। তবে ২৮তম ওভারে জেমি ওভারটনের বলে ক্রিজ ছেড়ে এগিয়ে এসে মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকানোর মধ্য দিয়ে নিজের ইনিংসে গতি আনেন এই অলরাউন্ডার।
এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে শুরু করেন শাদাব। ইনিংসে ১২টি চার ও পাঁচটি ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের বোলারদের চাপে রাখেন। পরিস্থিতি কঠিন হলেও অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নিয়ে ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে রান তোলেন। মাঝের ওভারগুলোতে ফিল্ডিং বিধিনিষেধ কাজে লাগিয়ে বাউন্ডারি আদায় করেন তিনি। অভিষিক্ত হেনরি ক্রোকম্ব ও লিয়াম ডসনের ওভারে টানা বাউন্ডারি মারার পর স্যাম কারান ও গাস অ্যাটকিনসনের বলেও বড় শট খেলেন।
ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে অ্যাটকিনসনের একটি ইয়র্কারে। বল শাদাবের বুটে আঘাত করলে আম্পায়ার তাঁকে এলবিডব্লিউ ঘোষণা করেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা উদ্যাপন শুরু করলেও হারিস রউফের পরামর্শে শাদাব রিভিউ নেন। প্রযুক্তিতে বল ব্যাটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শব্দ ধরা পড়ায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলে যায়। বেঁচে গিয়ে আবার ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। শাদাবের নিজেরও ধারণা ছিল না যে বলটি ব্যাটে লেগেছিল।
ম্যাচ শেষে শাদাব জানান, ওই মুহূর্তে তাঁর হতাশার কারণ ছিল বাউন্ডারি আদায় করতে না পারা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফিল্ডিংয়ের অবস্থান দেখে ওই বলে চার পাওয়ার সুযোগ ছিল বলে মনে হয়েছিল। আউট হয়ে গেলে পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। হারিস রউফই তাঁকে রিভিউ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
শাদাবের এই ইনিংস এসেছে এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তানের সীমিত ওভারের দলে তাঁর জায়গা নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৭ সালে সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বল হাতে কার্যকারিতা এবং ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাঁচ ইনিংসে ৩৮ ওভার বল করে মাত্র দুটি উইকেট নিয়েছিলেন তিনি; বোলিং গড় ছিল ১১৮.৫০। পরে এই সংস্করণে তাঁকে বাদ দিয়েই দল গঠনের চেষ্টা করে পাকিস্তান। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলেও জায়গা হয়নি তাঁর। চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে আবার ওয়ানডে দলে ফেরেন শাদাব।
নিজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে শাদাব স্বীকার করেন, প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় তাঁকে এবং দলের ব্যবস্থাপনাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে তাঁর ওপর আস্থা রাখায় দলীয় ব্যবস্থাপনাকে কৃতিত্ব দেন তিনি। শাদাব বলেন, একজন পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। তাঁর মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে সৃষ্টিকর্তা তাঁকে সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছেন।
এই জয়ে হারিস রউফের অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শেষ দিকে শাদাবের সঙ্গে জুটি বেঁধে ১৯ বলে অপরাজিত সাত রান করেন তিনি। আক্রমণাত্মক শট খেলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উইকেট আগলে রেখে শাদাবকে অন্য প্রান্তে ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। শেষ উইকেটে তাঁদের ৮৯ রানের জুটি সফল রান তাড়ায় নতুন রেকর্ড গড়েছে। ম্যাচের শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে পাকিস্তানের জয়ের আশা বাঁচিয়ে রাখেন রউফ।
শাদাব ও রউফ দুজনই রাওয়ালপিন্ডির বাসিন্দা। এর আগে বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একই মাঠে কঠিন পরিস্থিতিতে নবম উইকেটে জুটি গড়েছিলেন তাঁরা। সেবার ২৩২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের স্কোর ছিল আট উইকেটে ১৬৮। স্পিনবান্ধব উইকেটে ৪২ বলে ২১ রান যোগ করেন তাঁরা; রউফ ১৫ বল খেলেও রান করতে পারেননি। আগের সেই অভিজ্ঞতা এবারও তাঁদের পারস্পরিক আস্থায় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান শাদাব।
রউফের প্রশংসা করে শাদাব বলেন, ক্রিজে তাঁরা ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা না করে স্বাভাবিকভাবে সময় কাটিয়েছেন এবং পরিস্থিতি বুঝে খেলেছেন। তাঁর মতে, শেষ দিকের ব্যাটারদের মধ্যে সাধারণত যে আক্রমণাত্মক প্রবণতা থাকে, রউফ তা নিয়ন্ত্রণ করে দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেছেন। রউফের নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল এবং তিনি উইকেট না হারানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও জানান শাদাব।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয়ের মাধ্যমে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হবে দলটি। সিরিজে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকার ধারাও ধরে রাখতে চাইবে পাকিস্তান। সমালোচনার মধ্যে পাওয়া শাদাবের এই ইনিংস তাই শুধু একটি ম্যাচজয়ের গল্প নয়, বরং জাতীয় দলে নিজের অবস্থান নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে থাকল।
শাদাব খান পাকিস্তান ক্রিকেট
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!