ছবি:সংগৃহীত
রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো মৌলিক সেবা পেতে সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। সরাসরি বৈধ সংযোগের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক পরিবার স্থানীয় অনানুষ্ঠানিক সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বস্তিবাসীদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন্ডিকেট এসব সেবা সরবরাহ করে। ফলে সরকারি ব্যবস্থার বাইরে থাকা এই সেবার জন্য বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে।
রাজধানীর কড়াইল বস্তির এক বাসিন্দা জানান, একটি ছোট কক্ষে একটি বাতি ও একটি পাখা ব্যবহারের জন্য তাঁকে মাসে ৬০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। অথচ সরকারি শুল্ক বিবেচনায় একই পরিমাণ ব্যবহারের খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কথা।
কড়াইল, ভাসানটেক ও কল্যাণপুরের পোড়া বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বিদ্যুৎ নয়, পানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে।
কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রধান মিটার থেকে সাবমিটার বা সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো হয়। এই ব্যবস্থায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সরকারি দরের তুলনায় বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক বাসিন্দার দাবি, কিছু এলাকায় বিদ্যুতের ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী বিল নেওয়া হলেও এর সঙ্গে অতিরিক্ত সেবামূল্য যোগ করা হয়। আবার কোথাও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্ক আদায় করা হয়।
বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বস্তিতে ব্যক্তিগত সংযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকায় অনেক পরিবার যৌথ মিটারের ওপর নির্ভর করে। তবে এই ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও অননুমোদিত সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কড়াইল বস্তির কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, অননুমোদিত গ্যাস সংযোগের জন্য মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। এক চুলার সংযোগে কয়েকশ টাকা এবং দুই চুলার ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হয় বলে তাঁরা জানান।
স্থানীয়ভাবে গ্যাসলাইন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের কেউ কেউ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও কিছু এলাকায় তা আবার স্থাপনের ঘটনা ঘটে।
তিতাসের এক কর্মকর্তা বলেন, শুধু গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
কড়াইল বস্তিতে বিভিন্ন এনজিও ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদ্যোগে মিটারযুক্ত পানির সংযোগ রয়েছে। তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু স্থানীয় গোষ্ঠী এসব বৈধ সংযোগ থেকে অতিরিক্ত লাইন নিয়ে বিভিন্ন ঘরে পানি সরবরাহ করছে।
এ জন্য পরিবারপ্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের ভাষ্য, পানি কম ব্যবহার করলেও নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিটারযুক্ত সংযোগ থেকে পানি সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার নিয়ম নেই।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষকে আনুষ্ঠানিক ইউটিলিটি ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি। বৈধ সংযোগের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন বাসিন্দাদের অতিরিক্ত খরচ কমবে, অন্যদিকে অবৈধ সরবরাহের সুযোগও কমে আসবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বস্তিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির জন্য সমন্বিত নীতি তৈরি করা প্রয়োজন। এতে সেবার নিরাপত্তা ও মান বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, অবৈধ সংযোগ ও অনানুষ্ঠানিক সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বস্তিবাসীর দুর্ভোগ ঢাকার বস্তির খবর
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!