জয়া আহসান। ছবি : সংগৃহীত
দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান বরাবরই নিজেকে ভিন্নধর্মী ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। সম্পর্কের জটিলতা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন কিংবা সমাজবাস্তবতার গল্প—এমন নানা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সমালোচক ও দর্শক উভয়ের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে আবেগনির্ভর ও ভারী চরিত্রে অভিনয়ের পর এবার একটু ভিন্ন স্বাদের কাজ করতে চান তিনি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চরকি অ্যাওয়ার্ডসে ওয়েব অ্যান্থলজি ‘২ষ’-এর ‘বেসুরা’ পর্বে অভিনয়ের জন্য সেরা নারী অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পেয়েছে তার নতুন সিনেমা ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। নতুন সিনেমা, পুরস্কার এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জয়া জানিয়েছেন, এখন তিনি কিছুটা ‘হালকা’ মেজাজের চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ মূলত ২০২৩ সালের প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘অর্ধাঙ্গিনী’-এর সিক্যুয়েল। প্রথম সিনেমায় দর্শক দেখেছিলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর সুমন ও শুভ্রার বিচ্ছেদ হয়। পরে সুমনের জীবনে আসে মেঘনা, যার চরিত্রে অভিনয় করেন জয়া আহসান। নতুন সংসার শুরু হলেও আকস্মিক এক সেরিব্রাল অ্যাটাক সবকিছু বদলে দেয়। অসুস্থ স্বামীকে ঘিরে মেঘনাকে মুখোমুখি হতে হয় তার স্বামীর অতীত, সাবেক স্ত্রী এবং পারিবারিক নানা জটিল বাস্তবতার। নতুন ছবিতে সেই গল্পই আরও এগিয়ে গেছে। জয়ার ভাষায়, সময়ের সঙ্গে মেঘনা বদলেছে। সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মতো শক্তিশালী একজন নারী। তবে নতুন সিনেমাতেও তাকে নতুন সংকট ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, যা চরিত্রটিকে আরও গভীরতা দিয়েছে।

নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলির সঙ্গে জয়া আহসানের রসায়ন বরাবরই আলোচনায় থেকেছে। ২০১৭ সালে ‘বিসর্জন’ দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ‘বিজয়া’, ‘অর্ধাঙ্গিনী’ এবং এবার ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’—প্রতিটি কাজই দর্শকদের ভালোবাসা ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। ‘বিসর্জন’ ও ‘বিজয়া’র জন্য ফিল্মফেয়ার ইস্টসহ একাধিক সম্মাননাও অর্জন করেছেন জয়া। অনেকেই মনে করেন, কৌশিক গাঙ্গুলিই অভিনেত্রী হিসেবে জয়াকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। তবে জয়া নিজে বিষয়টিকে নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে চান না। তার মতে, হয়তো নির্মাতার চিত্রনাট্য, গল্প বলার ধরন কিংবা পরিচালনার দক্ষতাই এই সফলতার মূল কারণ। বিশেষ করে মানুষের সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতি পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে কৌশিক গাঙ্গুলির দক্ষতার প্রশংসা করেন তিনি।
গত এক বছরে ঢাকা ও কলকাতা—দুই জায়গাতেই একের পর এক বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান। ‘জয়া আর শারমিন’, ‘উৎসব’, ‘তাণ্ডব’, ‘ডিয়ার মা’, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ এবং ‘ওসিডি’-তে তার চরিত্রগুলো ছিল একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কখনো তিনি হয়েছেন করোনা মহামারিতে আটকে পড়া অভিনেত্রী, কখনো রহস্যময় ভূত, কখনো সাংবাদিক, কখনো মা, আবার কখনো সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত চরিত্র কুসুম। এসব চরিত্রের বেশিরভাগই ছিল আবেগঘন, মানসিকভাবে জটিল এবং অভিনয়শিল্পী হিসেবে বড় চ্যালেঞ্জের। তাই এবার কিছুটা স্বস্তিদায়ক ও প্রাণবন্ত চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। জয়া বলেন, একজন অভিনেত্রী হিসেবে তিনি সব ধরনের চরিত্রে কাজ করতে চান। দীর্ঘদিন ধরে জটিল চরিত্র করার পর এখন এমন কিছু গল্পে অভিনয় করতে চান, যেখানে দর্শক তাকে ভিন্ন এক মেজাজে দেখতে পাবেন। এ ধরনের কয়েকটি কাজ নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত চরকি অ্যাওয়ার্ডসে নুহাশ হুমায়ূনের অ্যান্থলজি সিরিজ ‘২ষ’-এর ‘বেসুরা’ পর্বে অভিনয়ের জন্য সেরা নারী অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন জয়া আহসান। এই কাজটিতে তিনি একটি রহস্যময় নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যাকে গল্পের শেষদিকে দর্শক ‘ডাইনি’ হিসেবে দেখতে পান। চরিত্রটির উপস্থিতি খুব অল্প সময়ের হলেও পুরো গল্পের আবহ এবং নাটকীয়তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেটি। জয়া জানান, চরিত্রটির কথা শুনেই তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার মতে, তিনি সবসময়ই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের চরিত্র করতে ভালোবাসেন। নুহাশ হুমায়ূন ও গুলতেকিন খানের লেখা গল্পটি তার কাছে এতটাই শক্তিশালী মনে হয়েছিল যে ছোট একটি চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও কাজটি করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। সেই চরিত্রের জন্য পুরস্কার পাওয়া তার কাছে বিশেষ আনন্দের।
বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ—দুই চলচ্চিত্র শিল্পেই সমান ব্যস্ত সময় পার করছেন জয়া আহসান। মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা থেকে শুরু করে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ কিংবা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। জনপ্রিয়তার চেয়ে ভালো গল্প ও শক্তিশালী চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নীতিতে তিনি বরাবরই অটল। তবে এবার সেই ব্যতিক্রমী অভিনেত্রীই জানিয়ে দিলেন, জীবনের মতো অভিনয়েও মাঝে মাঝে একটু স্বস্তির প্রয়োজন হয়। তাই আগামী দিনে দর্শক তাকে হয়তো কিছুটা হালকা, প্রাণবন্ত এবং ভিন্ন মেজাজের চরিত্রেও দেখতে পাবেন।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!