ছবি : সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা আকবর হোসেন পাঠান ফারুক—দর্শকের কাছে যিনি ‘মিয়া ভাই’ নামে পরিচিত—তার জন্মদিন আজ। গ্রামীণ জীবন ও সাধারণ মানুষের গল্পনির্ভর সিনেমায় শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
তবে জীবদ্দশায় নিজের জন্মদিন ঘিরে কোনো উৎসব বা আয়োজন পছন্দ করতেন না ফারুক। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৮ আগস্ট দিনটি তিনি আর আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করেননি।
ফারুক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ফারুকের কাছে নিজের জন্মদিনের আনন্দও অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
এই ঘটনার পর ১৮ আগস্ট জন্মদিনকে আর উৎসবের দিন হিসেবে দেখতেন না ‘মিয়া ভাই’। তাই জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি জন্মদিন উদযাপন থেকে বিরত ছিলেন।
১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট গাজীপুরে জন্মগ্রহণ করেন ফারুক। বাবা আজগার হোসেন পাঠানের পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন ফারুক। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজেকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করেন। যদিও এর আগেই চলচ্চিত্রে তার অভিষেক হয়।
এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে ফারুকের। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী কবরী।
এরপর খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এবং নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি।
১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সুজন সখী’ ও ‘লাঠিয়াল’ সিনেমা তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই অভিনেতাকে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ফারুক অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়নমনি’, ‘মাটির মায়া’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘সারেং বৌ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নদের চাঁদ’, ‘সখী তুমি কার’, ‘দোস্তী’, ‘লাল কাজল’, ‘ঝিনুক মালা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘শিমুল পারুল’, ‘মিয়া ভাই’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জীবন সংসার’ ও ‘কোটি টাকার কাবিন’।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি।
‘লাঠিয়াল’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ফারুক শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।
চলচ্চিত্রে ব্যস্ততা কমে যাওয়ার পর ফারুক সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৩ সালের ১৫ মে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যানকবর হোসেন পাঠান ফারুক। তার মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।
চলচ্চিত্রে তার অভিনয়, সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব এবং ‘মিয়া ভাই’ পরিচয় তাকে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে। জন্মদিনে কোনো উৎসব না করলেও দর্শকের ভালোবাসায় আজও বেঁচে আছেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।
ফারুকের জন্মদিন মিয়া ভাই ফারুক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক চলচ্চিত্রের মিয়া ভাই ফারুকের সিনেমা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!