যুক্তরাষ্ট্র   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১ আশ্বিন ১৪৩৩

গত শাসনামলে ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যার দাবি আইনমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩০ PM
গত শাসনামলে ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যার দাবি আইনমন্ত্রীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান; ছবি: সংগৃহীত

আগের শাসনামলে ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক কর্মী বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একই সময়ে প্রায় ৭০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬০ লাখের বেশি মানুষ রাজনৈতিক হয়রানির মুখে পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালামসহ সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সংবিধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানুষদের মধ্যে ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি ব্যক্তি আগের শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক হয়রানির ঘটনায় করা মামলার প্রায় ৯৯ শতাংশই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছিল।

বর্তমান সরকারের সময়ের প্রসঙ্গ তুলে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, গত ছয় মাসের বেশি সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে—এমন কোনো অভিযোগ তাঁরা পাচ্ছেন না বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।

সংবিধানের ভূমিকা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে সংবিধানই রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পথ দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু মিল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মার্কিন সংবিধানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৭৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের শুরুতে ‘উই, দ্য পিপল অব আমেরিকা’ এবং বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘উই, দ্য পিপল অব বাংলাদেশ’ লেখা হয়েছে। তাঁর মতে, দুই সংবিধানের মধ্যে এটি একটি উল্লেখযোগ্য মিল।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অন্যতম ভিত্তি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা। মতপ্রকাশ, সমাবেশ, চলাচল ও সংগঠনের স্বাধীনতাও এর সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধানেও মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন বিধান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিচারিক পর্যালোচনার প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ১৮০৩ সালের মারবারি বনাম ম্যাডিসন মামলার উদাহরণ দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ওই মামলায় বিচারিক পর্যালোচনার নীতি প্রয়োগ করেছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনেও সুপ্রিম কোর্ট একই ধরনের এখতিয়ার প্রয়োগ করে। তবে এই ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে জন লক, টমাস হবস ও মন্টেস্কুর রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি করেন আইনমন্ত্রী। তাঁর মতে, সংবিধান নিয়ে বিতর্ক কেবল আইনজ্ঞদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। সংবিধানের বিধান, সংশোধন ও প্রয়োগ নিয়ে এমন আলোচনা নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়েও বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, দেশে আরও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠনের লক্ষ্যেই আইনটি করা হয়েছে। আইনের কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার সুরক্ষাই এর মূল উদ্দেশ্য।

তিনি জানান, মানবাধিকার কমিশন আইনে ‘ওএফসিএটি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের বাছাই কমিটিতে প্রেসক্লাব ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিধান রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, বাছাই প্রক্রিয়ায় স্পিকারকে কমিটির প্রধান রাখা এবং বিরোধী দলের নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে এবং সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতি ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভঙ্গুর পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও চলছে বলে জানান তিনি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও কথা বলেন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিচার শেষ করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর বক্তব্য, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করাই সরকারের উদ্দেশ্য।

চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আইনমন্ত্রী বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নির্বাহীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এবং সরকারের হাতে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর দাবি, প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব অপরাধের বিচার হবে।

অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৭৮৭ সালে সংবিধান তৈরির সময় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানের শক্তি সব বিষয়ে ঐকমত্যে নয়; বরং মতভিন্নতার মধ্যেও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার সক্ষমতায়।

ক্রিস্টেনসেন ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবিধান সংশোধনের সুযোগকে মার্কিন সংবিধানের স্থায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

আইনমন্ত্রী

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!