ছবি: সংগৃহীত
২০২১ সালে ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী নৌকা ডুবে প্রাণহানির ঘটনায় অভিযুক্ত ১৪ জনের বিচার শুরু হয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু মারা যান। মামলার আসামিদের বেশির ভাগই আফগান নাগরিক।
আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার ঘটনায় দায় এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে অবৈধভাবে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে পাঠাতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অধিকাংশ আসামি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে ওই যাত্রার মূল সংগঠক হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। তারা পলাতক থাকায় অনুপস্থিতিতেই তাদের বিচার চলছে।
২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় ফ্রান্সের উপকূল থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি রওনা হয়। ইংলিশ চ্যানেলের মাঝামাঝি পৌঁছানোর পর নৌকাটিতে পানি ঢুকতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে নৌকাটি হালকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলে একপর্যায়ে যাত্রীরা পানিতে পড়ে যান।
দুর্ঘটনার সময় সমুদ্রের পানি অত্যন্ত ঠাণ্ডা ছিল। ফলে পানিতে পড়ে অনেকের মৃত্যু হয়। নৌকাটি সমুদ্রযাত্রার উপযোগী ছিল না এবং এতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি মানুষ ছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। যাত্রীদের পর্যাপ্ত ও মানসম্মত লাইফ জ্যাকেটও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর ২৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও চারজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। নিহতদের বড় একটি অংশ ছিলেন ইরাকি কুর্দি। এ ছাড়া সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, মিসর ও আফগানিস্তানের নাগরিকও নৌকাটিতে ছিলেন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটির বয়স ছিল সাত বছর।
দুর্ঘটনায় নিহতদের কয়েকজনের স্বজন বিচার শুরুর পর প্যারিসে গেছেন। তারা আদালতে উপস্থিত থেকে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন। বিচার কার্যক্রম প্রায় তিন সপ্তাহ চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহতদের কয়েকটি পরিবারের হয়ে আদালতে লড়ছেন আইনজীবী ইমানুয়েল দাউদ। বিচার শুরুর সময় তিনি মানবপাচারকারীদের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন। তার বক্তব্য, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা পেশাদার নাবিক নন এবং এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজনীয় দক্ষতাও তাদের নেই। এরপরও তাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পাঠানো হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আসামিদের কেউ কেউ অভিবাসীদের থাকার জায়গা ও পরিবহনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার জন্য ব্যবহৃত নৌকাটিও তারা সরবরাহ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার কথা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
তবে আসামিদের একটি অংশ দাবি করেছেন, তারাও অভিবাসী ছিলেন এবং ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকলেও মূল সংগঠকদের নির্দেশে কাজ করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রাটির মূল পরিকল্পনা তাদের ছিল না।
নৌকাডুবির পর ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশেই তদন্ত শুরু হয়। দুর্ঘটনার আগে নৌকাটিতে থাকা যাত্রীরা কয়েকবার সহায়তার জন্য ফোন করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। এরপরও বিপদে থাকা মানুষদের কাছে ফরাসি ও ব্রিটিশ উদ্ধারকারী বাহিনী দ্রুত পৌঁছাতে পারেনি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ফ্রান্সে এ ঘটনায় সাত সামরিক সদস্যের বিরুদ্ধেও বিচারিক তদন্ত চলছে। তাদের মধ্যে সামুদ্রিক উদ্ধারকেন্দ্রের কর্মী এবং একটি নৌবাহিনীর জাহাজের সদস্য রয়েছেন। বিপদে থাকা মানুষদের সহায়তায় ব্যর্থতার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা হবে কি না, তা তদন্ত শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্যেও দুর্ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত হয়েছে। সেখানে তদন্তে ডোভারে কর্মী সংকটের কারণে উপকূলরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। দুর্ঘটনার রাতে খারাপ আবহাওয়ার কারণে একটি নজরদারি বিমানও পাঠানো সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ছোট নৌকায় থাকা অভিবাসীরা বিপদের মাত্রা অনেক সময় বাড়িয়ে জানান—উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল। এর ফলে ওই রাতে নৌকাটিতে থাকা মানুষদের প্রকৃত বিপদের মাত্রা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!