যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে চার পরিকল্পনা সরকারের

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ PM ১০
ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে চার পরিকল্পনা সরকারের

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর যানজট কমানো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে চারটি উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বাসমালিক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব উদ্যোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, রাজধানীর যানজট কমাতে বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নিলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন। তাই পুরোনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, রুট সংস্কার ও অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগগুলো সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমানো, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহনকে আরও কার্যকর করাই এ উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য।

সরকারের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া। রাজধানীর কিছু পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাস যান্ত্রিক ত্রুটি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনের কারণে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে এসব বাস একসঙ্গে সরিয়ে নিলে গণপরিবহনের সরবরাহ কমে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। এ কারণে বিকল্প বাসের ব্যবস্থা, প্রকৃত যানবাহনের চাহিদা নিরূপণ এবং পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাসের মান উন্নয়নের পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণে নজরদারিও প্রয়োজন। নতুন বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলে সেগুলোর অর্থায়ন, পরিচালন ব্যয় ও পরিবেশগত সুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাসের চাপ কমাতে টার্মিনাল স্থানান্তর বা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন আরেকটি পরিকল্পনা। সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানের মতো এলাকায় বাসের প্রবেশ ও বের হওয়া, যাত্রী ওঠানামা এবং পার্কিংয়ের কারণে আশপাশের সড়কে চাপ তৈরি হয়। এসব স্থানে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে যান চলাচল সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে টার্মিনাল শহরের প্রান্তে সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন অবস্থানের সঙ্গে শহরের অভ্যন্তরীণ পরিবহনসংযোগ, যাতায়াতের সময়, ভাড়া ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। টার্মিনাল থেকে গন্তব্যে যাওয়ার পর্যাপ্ত বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য পরিবহনসুবিধা না থাকলে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। আন্তজেলা বাসের চলাচল এবং মহানগরীর ভেতরের গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠাও জরুরি।

সরকারের তৃতীয় উদ্যোগ পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার। কোন রুটে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রুট সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু সড়কের অবস্থা নয়, বাস চলাচলের পথ, যাত্রী ওঠানামার স্থান, স্টপেজ, সংযোগকারী সড়ক এবং যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে একই পথে একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো এবং যাত্রী তোলার জন্য হঠাৎ লেন পরিবর্তনের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। আবার কিছু এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় বাস কম থাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রুট পুনর্বিন্যাসের সময় যাত্রী চলাচলের তথ্য, কর্মব্যস্ত সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের অবস্থান এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। রুট পরিবর্তনের কারণে কোনো এলাকার মানুষ যেন সরাসরি পরিবহনসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য বিকল্প রুট ও সংযোগকারী বাসের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

চতুর্থ উদ্যোগটি হলো অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলাচল, যানজট এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের যোগ্যতা, নিরাপত্তার মান, চলাচলের অনুমোদিত এলাকা, পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার নিয়ম এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।

সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহনের গতি ও নিরাপত্তা বিবেচনায় কোন পথে কোন ধরনের যান চলবে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত স্ট্যান্ড নিশ্চিত না করে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে। নীতিমালা তৈরির সময় চালক, মালিক, যাত্রী ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বাসসকে বলেন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন ও নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় রেখে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ও যাত্রীসেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে। তাঁর ভাষ্য, এ ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা ও গণপরিবহনের সহজলভ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং পরিবহনমালিকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ কতটা এগোবে এবং অগ্রগতি কীভাবে পরিমাপ করা হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাসের গড় যাত্রাসময়, স্টপেজে অপেক্ষার সময়, যানজটের স্থায়িত্ব, সড়ক দুর্ঘটনার হার এবং গণপরিবহনে যাত্রীর সংখ্যা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তাঁদের মতে, নতুন সড়ক বা উড়ালসড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কের সুষ্ঠু ব্যবহার, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও ঢাকার যানজট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার যানজট

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!