তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; ছবি: সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসের মধ্যে কথিত আসন সমঝোতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কংগ্রেসের সাবেক রাজ্য সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, ৬ অক্টোবরের ভোটে নন্দীগ্রাম কংগ্রেসকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তৃণমূল। বিনিময়ে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর আসনে তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল। তবে তৃণমূলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ এমন কোনো প্রস্তাব দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
প্রদীপ ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, উপনির্বাচনের তফসিল প্রকাশের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দিল্লিতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি পিটিআইকে জানান, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে সময় চেয়েছিল এবং পরে পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে। রাজ্য নেতৃত্ব তখন মনে করেছিল, তৃণমূলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার জন্য সময়টি উপযুক্ত নয়।
তাঁর দাবি, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের একাধিক প্রবীণ নেতার মতামত নেয়। তাদের বড় একটি অংশ তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষে ছিল। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতার বক্তব্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃণমূলের সঙ্গে জোট করলে রাজ্যে কংগ্রেসের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এই পুরো দাবির বিষয়ে তৃণমূলের অবস্থান ভিন্ন। প্রদীপ ভট্টাচার্যের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কুণাল ঘোষ সংক্ষিপ্তভাবে কোনো ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। ফলে নন্দীগ্রামকে ঘিরে দুই দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
এবারের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সঞ্চিতা প্রধানকে প্রার্থী করেছে। কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধান। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির থেকে মোহাম্মদ এতেসামুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিজেপি নন্দীগ্রামে হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাবেক সহযোগী চন্দ্রনাথ রথের মা। ৬ অক্টোবর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে এবং ৯ অক্টোবর ভোট গণনা হবে।
নন্দীগ্রাম আসনটি এবারের উপনির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই আসন থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে তিনি ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে দেন। সেই কারণেই এই আসনে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্ব অবশ্য তারও আগে থেকে। ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের সরাসরি নির্বাচনী সমঝোতার কোনো ঘোষণা নেই। বরং দুই দলই নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। পাশাপাশি তৃণমূলের ভেতরের বিভাজনের কারণে একই আসনে দলটির দুই শিবিরের প্রার্থীও রয়েছেন। ফলে নন্দীগ্রামে এবার একাধিক রাজনৈতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে।
তৃণমূল ও কংগ্রেসের সম্পর্কের পটভূমিতেও রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধ। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে সরানোর সময় দুই দল জোটসঙ্গী ছিল। পরে মতবিরোধের কারণে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। রাজ্যে কংগ্রেসের একাধিক নেতা-কর্মীর তৃণমূলে যোগ দেওয়াও দুই দলের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।
জাতীয় রাজনীতিতে অবশ্য দুই দলের সম্পর্কের আরেকটি দিক রয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিবিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণে তৃণমূল ও কংগ্রেস একই জোট কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গে আসন সমঝোতার প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল এবং রাজ্য পর্যায়ে আলাদা অবস্থানও দেখা গেছে।
এখন নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের কথিত যোগাযোগের দাবি সামনে আসায় নতুন করে জোটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে এবং দুই দলই নন্দীগ্রামে আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। ফলে উপনির্বাচনের আগে এ নিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা এখনো অনিশ্চিত।
পশ্চিমবঙ্গ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!