যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের গুরুত্ব কি কমছে, চীন-আমেরিকা সমঝোতায় নতুন বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫০ PM ৪৩
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের গুরুত্ব কি কমছে, চীন-আমেরিকা সমঝোতায় নতুন বাস্তবতা

ছবি:সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং যখন সরাসরি আলোচনা ও দর-কষাকষির মাধ্যমে নিজেদের বিরোধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব আগের অবস্থানে আছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনকে মোকাবিলায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার যে ধারণা দীর্ঘদিন ধরে ছিল, সাম্প্রতিক কিছু মার্কিন সিদ্ধান্তে তার পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং চীনের সঙ্গে আলোচনায় বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়কে দর-কষাকষির অংশ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাম্প্রতিক আলোচনায় বড় কোনো স্থায়ী সমঝোতার বদলে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সমঝোতার চিত্র দেখা গেছে। দুই দেশ বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্য, বিরল মৃত্তিকা, বিনিয়োগ, পরিশোধিত তেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ক এখন ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’র পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, তবে একই সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা চলবে।

দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়মিত বৈঠকও এই প্রক্রিয়ার অংশ। এতে কোনো বিরোধ বড় সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই আলোচনার মাধ্যমে তা সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন সমীকরণে তাইওয়ান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওয়াশিংটন তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকেও বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় কৌশলগত চাপ তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।

চীনের জন্য তাইওয়ান অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তা তাইওয়ানের নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত সরাসরি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অবস্থায় ভারতের জন্য প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো অংশীদারের নিরাপত্তা ও স্বার্থকেও চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে ওয়াশিংটনের কাছে ভারতের অবস্থান কতটা আলাদা?

চীন-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বিরল মৃত্তিকা উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে সামনে এসেছে। এসব উপাদান প্রযুক্তি, শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

চীন এসব উপাদানের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটনকে কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে আলোচনার টেবিলে শুধু সামরিক শক্তি নয়, অর্থনৈতিক ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণও বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।

ভারতের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়বে, ওয়াশিংটনের কাছে নয়াদিল্লির গুরুত্বও তত বাড়বে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি করেছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন ভারতের ওপরও বিভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও শুল্কনীতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব দেখা যেতে পারে।

ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা চাপ তৈরির সমপর্যায়ের কোনো অর্থনৈতিক হাতিয়ার নয়াদিল্লির হাতে সবসময় থাকে না। ফলে দুই পরাশক্তির দর-কষাকষির সময় ভারতকে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির প্রভাব বহন করতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু চীনকে কেন্দ্র করে দেখলে ভারতের কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। বরং নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ভারতের বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী নৌ-উপস্থিতি, বড় পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্র ভারতের নিজস্ব কৌশলগত মূল্য বাড়াতে পারে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো বা খারাপ—যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক, ভারতের গুরুত্ব যেন বজায় থাকে, সে জন্য নিজেদের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী বৈঠকগুলোতে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি কীভাবে এগোয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত দীর্ঘ সময় স্থগিত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারদের বিষয়ে নতুন নীতির ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হতে পারে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটন যদি শেষ পর্যন্ত তাইওয়ানের অস্ত্র চুক্তি এগিয়ে নেয়, তাহলে সেটি চীনের সঙ্গে সাময়িক দর-কষাকষির কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পরিবর্তন ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা। ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে নিজস্ব অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব শক্তিশালী করাই ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!