যুক্তরাষ্ট্র   রবিবার ২ আগস্ট ২০২৬,১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঢাকা ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান ড. সাব্বির মোস্তফা খান: গবেষণা, সুশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

পপি দেবী থাপা

পপি দেবী থাপা

প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৫ PM

৪৮
ঢাকা ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান ড. সাব্বির মোস্তফা খান: গবেষণা, সুশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

ড. সাব্বির মোস্তফা খান । ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার নিরাপদ পানি সরবরাহ, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা- এই চারটি বিষয় এখন রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এমনই এক সময়ে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান। তাঁর নিয়োগকে অনেকেই কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক নেতৃত্বের সূচনা হিসেবে দেখছেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৫ অনুসারে তাঁকে তিন বছরের জন্য ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নগর ড্রেনেজ এবং জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর এই দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ড. সাব্বির মোস্তফা খান বাংলাদেশের পানি সম্পদ প্রকৌশল খাতের পরিচিত একাডেমিক ও গবেষক। তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পানি সম্পদ কৌশলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (UCLA)-এ অধ্যয়ন করেন। সেখানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

১৯৯৭ সালে বুয়েটে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি ধাপে ধাপে অধ্যাপক এবং পরে পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হন। প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; গবেষণা, নীতিনির্ধারণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং পেশাজীবী নেতৃত্ব-সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

 

গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে নগর পানি ব্যবস্থাপনা:

ড. সাব্বির মোস্তফা খানের গবেষণার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নগর জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, নদীর প্রবাহ, বন্যা পূর্বাভাস, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন।

এই গবেষণাগুলো কেবল একাডেমিক নয়; বাস্তব নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পানি নিষ্কাশন সংকটের মতো সমস্যাগুলো বিশ্লেষণে এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে নগর পানি ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক মডেলিং, পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং জলবায়ু অভিযোজনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ড. সাব্বিরের গবেষণার বড় অংশও এই ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা:

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে নয়, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পেও ড. সাব্বির মোস্তফা খানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি ৫০টিরও বেশি জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পে পানি বিশেষজ্ঞ, হাইড্রোলজিস্ট, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কিংবা টিম লিডার হিসেবে কাজ করেছেন।

পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রাজউকের ড্রেনেজ পরিকল্পনাসহ একাধিক প্রকল্পে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (খএঊউ), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (জঐউ) এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের জটিলতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা দিয়েছে।

 

গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা:

ড. সাব্বির মোস্তফা খানের ৪০টিরও বেশি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছেন এবং বহু স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি গবেষকের তত্ত্বাবধান করেছেন।

গবেষণার পাশাপাশি তিনি ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর সম্মানী সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একাডেমিক, পেশাগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক- তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

 

ঢাকা ওয়াসার সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ:

তবে নতুন চেয়ারম্যানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতা নয়; বরং সেই যোগ্যতাকে কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। ঢাকা এখনও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ক্রমাগত পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিকল্প পানির উৎস নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে রাজধানীর অনেক এলাকায় এখনও আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পৌঁছায়নি। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা শুধু নাগরিক দুর্ভোগই বাড়ায় না, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও ব্যাহত করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধিও নগর পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।

 

যথেষ্ট নয় শুধু প্রকৌশল দক্ষতা:

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি একমাত্র শর্ত নয়। ঢাকা ওয়াসার সেবার মান উন্নত করতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা।

ওয়াসার কার্যক্রমে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মনিটরিং, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নাগরিক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়তে পারে।

 

নতুন নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা:

ড. সাব্বির মোস্তফা খানের নিয়োগের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, পানি সম্পদ ও নগর ড্রেনেজ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন গবেষক এখন এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এসেছেন, যার মূল কাজই পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা।

তাঁর গবেষণা, আন্তর্জাতিক শিক্ষা এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা অবশ্যই একটি শক্তিশালী সূচনার আভাস দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে তিনি কতটা কার্যকরভাবে দল পরিচালনা করতে পারেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে পারেন এবং নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন।

ঢাকার দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানির চাহিদা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় আগামী তিন বছর শুধু একজন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের সময় নয়; বরং ঢাকা ওয়াসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সুযোগও বটে। সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে ড. সাব্বির মোস্তফা খানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন।

২ মন্তব্য


No name

আলহামদুলিল্লাহ। ❤️🤲

০২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৪ PM
No name

আলহামদুলিল্লাহ। ❤️🤲

০২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৪ PM