যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ১৭ জুন ২০২৬,২ আষাঢ় ১৪৩৩

ইন্টারপোল কীভাবে বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের খুঁজে বের করে? সীমান্তপারের অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গল্প

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০১:৫৬ PM

ইন্টারপোল কীভাবে বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের খুঁজে বের করে? সীমান্তপারের অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গল্প

ইন্টারপোলের সদর দপ্তর ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন কার্যক্রম। ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্বায়নের এই যুগে অপরাধও ক্রমেই সীমান্তের গণ্ডি অতিক্রম করছে। এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার, সাইবার হামলা, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান এবং সন্ত্রাসবাদ—এসব অপরাধ মোকাবিলায় একক কোনো দেশের পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে ইন্টারপোল।

ইন্টারপোল কী?

ইন্টারপোলের পূর্ণরূপ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (INTERPOL)। এটি কোনো আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনী নয়; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে সমন্বয়কারী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।

ফ্রান্সের লিঁও শহরে অবস্থিত সংস্থাটির সদর দপ্তর। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৬টি দেশ এর সদস্য। আন্তর্জাতিক অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা, তথ্য বিনিময় সহজ করা এবং সীমান্তপারের অপরাধ দমনে সহযোগিতা করাই এর মূল কাজ।

যেভাবে শুরু হয় ইন্টারপোলের যাত্রা

১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার প্রাথমিক নাম ছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ কমিশন (ICPC)। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে এর বর্তমান নামকরণ করা হয়।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পলাতক অপরাধীদের শনাক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে সংস্থাটি।

ইন্টারপোল কীভাবে কাজ করে?

অনেকের ধারণা, ইন্টারপোলের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী রয়েছে এবং তারা বিশ্বের যেকোনো দেশে অভিযান চালাতে পারে। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ইন্টারপোল নিজে কাউকে গ্রেপ্তার করে না। কোনো দেশে অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতাও তাদের নেই। সংস্থাটি মূলত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

ইন্টারপোলের বিশাল ডাটাবেজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরাধী, পলাতক আসামি, চুরি হওয়া পাসপোর্ট, যানবাহন, অস্ত্র এবং অন্যান্য অপরাধ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। সদস্য দেশগুলোর জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো (NCB) এই তথ্য আদান-প্রদানের কাজ পরিচালনা করে।

রেড নোটিশ কী?

ইন্টারপোলের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো রেড নোটিশ

তবে এটি কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। রেড নোটিশের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে জানানো হয় যে কোনো ব্যক্তি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তাকে শনাক্ত করে অস্থায়ীভাবে আটক করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতেই রেড নোটিশ জারি করা হয়।

আন্তর্জাতিক পলাতককে ধরার প্রক্রিয়া

কোনো অপরাধী বিদেশে পালিয়ে গেলে তাকে ধরতে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়—

  • আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
  • সংশ্লিষ্ট দেশ ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশের আবেদন করে।
  • আবেদন যাচাইয়ের পর সদস্য দেশগুলোর কাছে নোটিশ পাঠানো হয়।
  • অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত হলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করে।
  • প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বহু আন্তর্জাতিক অপরাধী বছরের পর বছর আত্মগোপনে থাকার পরও গ্রেপ্তার হয়েছে।

ইন্টারপোলের সহায়তায় আলোচিত গ্রেপ্তার

  • চার্লস শোভরাজ: ‘দ্য সার্পেন্ট’ ও ‘বিকিনি কিলার’ নামে পরিচিত চার্লস শোভরাজ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়।

  • রাতকো ম্লাডিচ: বসনিয়া যুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এই সাবেক সামরিক নেতাকে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০১১ সালে গ্রেপ্তার করা হয়।

  • এল চাপো গুজমান: মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া কার্টেলের প্রধান এল চাপো একাধিকবার কারাগার থেকে পালিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তাকে আটক করা সম্ভব হয়।

  • ফেলিসিয়েন কাবুগা: রুয়ান্ডার গণহত্যার অন্যতম অভিযুক্ত কাবুগা প্রায় ২৬ বছর আত্মগোপনে ছিলেন। ২০২০ সালে তাকে ফ্রান্সে গ্রেপ্তার করা হয়।

  • জেমস ইবোরি: নাইজেরিয়ার সাবেক গভর্নর জেমস ইবোরির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ছিল। আন্তর্জাতিক তদন্ত ও সহযোগিতার মাধ্যমে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

  • মুনাওয়ার খান: ভারতের ব্যাংক জালিয়াতি মামলার অভিযুক্ত মুনাওয়ার খানকে কুয়েত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০২৫ সালে বড় আন্তর্জাতিক অভিযান

২০২৫ সালে ইন্টারপোলের সমন্বয়ে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক অভিযানে ১৭টি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অংশ নেয়। অভিযানে বিভিন্ন দেশের রেড নোটিশভুক্ত ৮৫ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে সমন্বিত প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় ইন্টারপোলের গুরুত্ব

বর্তমান বিশ্বে অপরাধের ধরন ও পরিধি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, সন্ত্রাসবাদ, অর্থ পাচার ও আন্তর্জাতিক জালিয়াতির মতো অপরাধ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিজস্ব গ্রেপ্তার ক্ষমতা না থাকলেও তথ্যভিত্তিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ইন্টারপোল বিশ্বের অন্যতম কার্যকর আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সীমান্তপারের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এই সংস্থার ভূমিকা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!