যুক্তরাষ্ট্র   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকার দুই সিটিতে তিন দলের ভিন্ন কৌশল, জমছে মেয়র নির্বাচনের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৬ PM ১১
ঢাকার দুই সিটিতে তিন দলের ভিন্ন কৌশল, জমছে মেয়র নির্বাচনের লড়াই

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বাড়ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও দুই সিটিতে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বাছাই করে নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। ফলে দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে তিন রাজনৈতিক শক্তির আলাদা সমীকরণ ভোটের মাঠে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার নির্দলীয় পদ্ধতিতে হওয়ায় ব্যালটে কোনো দলের প্রতীক থাকবে না। বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ না থাকায় নিজেদের সমর্থিত ব্যক্তিকে নির্বাচনে এগিয়ে নেবে। এতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট দলের সাংগঠনিক প্রভাব—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকা উত্তরে মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং দক্ষিণে মো. আবদুস সালামের নাম প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁদের দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দলীয় সূত্রের দাবি, প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নাগরিক সেবা পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়েও তাঁদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে দুই সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে দলের ভেতরে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত ও জরিপের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামও নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, দায়িত্ব নেওয়ার আগে সংস্থাটির কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির ছিল। এখন নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানান।

বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা অবশ্য বলেছেন, আপাতত দুই প্রার্থীর নাম ঠিক থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে জরিপ বা মতামত নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

জামায়াতও দুই সিটিতে পছন্দের প্রার্থী অনেকটা নির্ধারণ করে ফেলেছে। দলটি ঢাকা উত্তর সিটিতে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, তাঁকে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির। এর আগে তিনি সিলেট-৬ আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সেবামূলক কার্যক্রমে তাঁকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে সাদিক কায়েম বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি। গত জুলাই পর্যন্ত তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য। তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতির বড় অংশ গড়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে।

জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য, ডাকসুর দায়িত্বে থাকায় সাদিক কায়েমের দলীয় কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্য অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। তবে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর তৎপরতা রয়েছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার বলেন, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। নগরবাসী তাঁকে বিজয়ী করে তাঁদের প্রত্যাশা পূরণের পথে এগিয়ে নেবেন বলে তাঁরা আশাবাদী।

সোমবার ঢাকার একটি দলীয় অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতির কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতেও প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি উত্তরে সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে সাদিক কায়েমের নাম উল্লেখ করেন।

এদিকে এনসিপি দুই সিটিতে সরাসরি প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট করেছে। গত রোববার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন।

আসিফ মাহমুদের জন্য এটি হবে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রথম বড় পরীক্ষা। এর আগে তিনি সংসদ কিংবা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হননি। অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন।

সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে দুই প্রার্থীর ভোটার এলাকাতেও পরিবর্তন এসেছে। আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তর সিটির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হয়েছেন। আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণ সিটির ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হয়েছেন। এরপরই তাঁদের দুই সিটির মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

তিন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পরিচয়েও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। বিএনপি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে সামনে আনছে। দক্ষিণের আবদুস সালাম দীর্ঘদিন মহানগর দক্ষিণ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য।

উত্তরের সম্ভাব্য প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন।

জামায়াতের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও ভিন্ন সমীকরণ রয়েছে। উত্তরে সেলিম উদ্দিন নগর সংগঠনের পরিচিত নেতা। দক্ষিণে সাদিক কায়েম ছাত্ররাজনীতি ও ডাকসুর নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন। অন্যদিকে এনসিপি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত দুই পরিচিত মুখকে মেয়র পদে সামনে এনেছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এরই মধ্যে জানিয়েছেন, দলটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেবে না। তবে তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে জয়ী করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, দলীয় প্রতীক না থাকায় এবারের সিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন কোনো প্রার্থীকে কতটা সুবিধা দেয়, সেটিও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কেবল মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি তিন রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তারও পরীক্ষা হতে পারে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের দলীয় সংগঠন, ছাত্ররাজনীতির পরিচিতি নাকি নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবেদন—ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণকে বেশি গুরুত্ব দেন, তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হবে।

মেয়র নির্বাচনে

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!