যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬,১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, হুমকিতে ইলিশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১১:১২ AM

১৪
বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, হুমকিতে ইলিশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

মাছ ধরতে ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে যাচ্ছেন জেলেরা। ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গোপসাগরে অবৈধভাবে পরিচালিত রূপান্তরিত ট্রলিং বোটের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় জেলেদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ট্রলিং সিন্ডিকেটের নির্বিচার মাছ আহরণের কারণে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক জেলেরা এবং প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় অর্থনীতিতেও।

শনিবার (৪ জুলাই) পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলীপুর ও আশাখালী উপকূলসংলগ্ন এলাকায় সরেজমিনে একাধিক রূপান্তরিত ট্রলিং বোটের চলাচল দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি এবং প্রভাবশালী চক্রের কারণে এসব ট্রলিং বোট নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকার ঘোষিত ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর নতুন আশায় সমুদ্রে যান হাজারো জেলে। তবে জ্বালানি, বরফ ও রসদে বিপুল ব্যয় করেও অধিকাংশ ট্রলার প্রয়োজনীয় মাছ নিয়ে ফিরতে পারেনি। জেলেদের অভিযোগ, তারা জাল ফেলতে না ফেলতেই অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো সমুদ্রের বড় অংশ থেকে মাছ তুলে নিচ্ছে।

মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, বিপুল অর্থ ব্যয় করেও এখন আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। তার অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক প্রকাশ্যে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে গেলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার এবং উইঞ্চ মেশিনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণে সহায়তা করছে।

মৎস্য সংশ্লিষ্টরা জানান, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি থাকলেও অনেক ট্রলিং বোট উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় মাছ শিকার করছে। বিশেষ করে বটম ট্রলিং পদ্ধতিতে ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে টেনে নেওয়ায় প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ক্ষুদ্র ফাঁসের জালে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণু ও কাঁকড়ার বাচ্চাও ধরা পড়ছে।

জেলে আবুল কাশেম বলেন, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সমুদ্রে মাছের সংকট আরও প্রকট হবে।

ক্ষুদ্র নৌকার জেলেদের অভিযোগ, বড় ট্রলিং বোটের কারণে তাদের জাল প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে গেলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

মহিপুরের মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, আগের তুলনায় ঘাটে মাছের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে ইলিশ, রূপচাঁদা, লইট্টাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি অবৈধ ট্রলিং এখন দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের অন্যতম বড় হুমকি। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন ব্যাহত হবে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, ট্রলিং বোট-সংক্রান্ত বিষয় আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

পটুয়াখালীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি এবং অভিযান আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

উপকূলবাসীর দাবি, অবৈধ ট্রলিং শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়, এটি দেশের সামুদ্রিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। তাই অবৈধ ট্রলিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!