যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬,১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

সিগারেটের বাড়তি দামের পেছনে কার লাভ? সরবরাহ ব্যবস্থায় হারাচ্ছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০২:০৯ PM

২৬
সিগারেটের বাড়তি দামের পেছনে কার লাভ? সরবরাহ ব্যবস্থায় হারাচ্ছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

ছবি: সংগৃহীত

দেশের বাজারে সিগারেট বিক্রির ক্ষেত্রে প্যাকেটে লেখা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের সিগারেটই সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিগারেট কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে ডিলার বা পরিবেশকদের কাছে প্রায় এমআরপি দামে পণ্য সরবরাহ করে। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য স্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ থাকে না। নিজেদের লাভ ধরে রাখতে তারা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করছেন।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের বাজার থেকেই সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্ভাব্য রাজস্ব হারাতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ১০ শলাকার সিগারেটের জন্য বিভিন্ন স্তরে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছে। নিম্ন স্তরের জন্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের জন্য ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের জন্য ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের জন্য ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

তবে বাজারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট। নিম্ন স্তরের ডার্বি, মধ্যম স্তরের ক্যামেল, উচ্চ স্তরের গোল্ডলিফসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি এক শলাকা সিগারেট বিক্রির ক্ষেত্রেও দামের পার্থক্য আরও বেশি দেখা যায়। কারণ দেশের বড় একটি অংশের ধূমপায়ী পুরো প্যাকেটের বদলে একটি বা কয়েকটি শলাকা কিনে থাকেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতা শলাকা হিসেবে সিগারেট বিক্রি করেন। ফলে নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তব বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান আরও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার মূল কারণ সিগারেটের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদকরা সাধারণত পাইকারি পর্যায়ে কম দামে পণ্য সরবরাহ করেন, যাতে বিক্রেতারা লাভ করতে পারেন। কিন্তু সিগারেটের ক্ষেত্রে সরবরাহ কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. শফিউন নাহিন শিমুল বলেন, এমআরপি সাধারণত ভোক্তার সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য হওয়ার কথা। কিন্তু পরিবেশকরাই যদি ওই দামে পণ্য কিনে ফেলেন, তাহলে খুচরা বিক্রেতাদের লাভের জায়গা থাকে না।

সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানি থেকে পাইকারি বিক্রেতা এবং পরে খুচরা পর্যায়ে যাওয়ার সময় ধাপে ধাপে সিগারেটের দাম বাড়তে থাকে।

এদিকে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব নিয়েও রয়েছে মতভেদ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এমআরপির বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করা আইনসঙ্গত নয়। তবে বাজার তদারকির দায়িত্ব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বলে তারা উল্লেখ করেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিগারেট সাধারণ নিত্যপণ্যের তালিকায় না থাকায় নিয়মিত বাজার অভিযানে এটি সবসময় গুরুত্ব পায় না। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করে।

জনস্বাস্থ্য ও কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু প্যাকেটে এমআরপি লিখে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তারা পাইকারি, পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ের জন্য আলাদা মূল্য কাঠামো নির্ধারণ, শলাকা বিক্রির নিয়ম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থার সংস্কার না হলে একদিকে ভোক্তারা অতিরিক্ত অর্থ দিতে থাকবেন, অন্যদিকে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।

সিগারেটের দাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!