বিশ্বকাপ পূর্বাভাসের চার্ট হাতে অনুপ তালুকদার। ছবি: সংগৃহীত
ডেটা সায়েন্স ও আধুনিক পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ফলাফল নিয়ে করা এক বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত বাস্তবের সঙ্গে মিলে গেছে। ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার এক মাসেরও বেশি আগে বাংলাদেশের তরুণ পরিসংখ্যানবিদ অনুপ তালুকদার জানিয়েছিলেন, সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হতে পারে স্পেন এবং ফাইনালে মুখোমুখি হতে পারে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ শেষে দেখা যায়, তার সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের বড় মিল রয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী অনুপ তালুকদার গত ১১ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘২০২৬ FIFA World Cup Prediction’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে বিশ্বকাপের সম্ভাব্য ফলাফল তুলে ধরেছিলেন।
তার তৈরি বিশ্লেষণে সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট, ফাইনালিস্ট এবং চ্যাম্পিয়ন দলের সম্ভাবনা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় চারটি দলই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়। একই সঙ্গে ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই দুই দলই ফাইনালে খেলেছে এবং স্পেন বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে।
অনুপের তৈরি প্রেডিকশন ইঞ্জিনে দুটি পৃথক মডেল ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল ‘রিয়েলিস্টিক মডেল’। এই মডেলে দলের ইএলও রেটিং, বেটিং মার্কেটের সম্ভাবনা, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং পোয়াসঁভিত্তিক মন্টে কার্লো সিমুলেশন ব্যবহার করা হয়।
অন্য মডেলটি ছিল মেশিন লার্নিংভিত্তিক। এতে ঐতিহাসিক ম্যাচের তথ্য ব্যবহার করে র্যান্ডম ফরেস্ট ক্লাসিফায়ার মডেলের মাধ্যমে প্রতিটি ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়।
এই বিশ্লেষণের জন্য অনুপ ব্যবহার করেন ৪৯ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচের তথ্য, ৪৭ হাজারের বেশি গোলদাতার রেকর্ড, ৬৭৫টি পেনাল্টি শুটআউটের তথ্য, বিভিন্ন দলের ইএলও রেটিং, বেটিং অডস, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, আক্রমণ ও রক্ষণভাগের সক্ষমতা এবং পেনাল্টি পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান।
এরপর পুরো বিশ্বকাপের সম্ভাব্য ফলাফল জানতে ১০ হাজারবার সিমুলেশন চালানো হয়। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি দলের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা, ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা এবং নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা নির্ধারণ করা হয়।
অনুপের রিয়েলিস্টিক মডেল অনুযায়ী, বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ছিল স্পেনের। স্পেনের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল ২২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এরপর ছিল আর্জেন্টিনা ১৪ দশমিক ৬১ শতাংশ, ফ্রান্স ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ, ইংল্যান্ড ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ, পর্তুগাল ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ব্রাজিল ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং জার্মানি ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
বর্তমানে অনুপ তালুকদার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি অনুষদের অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিক্স বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছেন।
নিজের এই বিশ্লেষণ সম্পর্কে অনুপ বলেন, পরিসংখ্যানের শিক্ষার্থী এবং ফুটবলের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি এই গবেষণাধর্মী প্রজেক্ট শুরু করেন। প্রায় দেড় মাস সময় নিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হয়েছে।
তিনি জানান, ৪৯ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৪৭ হাজারের বেশি গোলস্কোরারের তথ্য এবং শত শত পেনাল্টি শুটআউটের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পরিসংখ্যানিক মডেলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল বের করা হয়।
বিশ্বকাপের ফলাফল নিজের বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলে যাওয়ার বিষয়ে অনুপ বলেন, ফুটবলে শতভাগ নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একটি ইনজুরি, লাল কার্ড কিংবা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ম্যাচের পুরো চিত্র বদলে দিতে পারে। তবে তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণে স্পেনকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন এবং স্পেন-আর্জেন্টিনাকে সম্ভাব্য ফাইনালিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবের সঙ্গে মিলে গেছে।
ডেটা সায়েন্স ও ক্রীড়া বিশ্লেষণের এই উদাহরণ দেখিয়ে অনুপ তালুকদার প্রমাণ করেছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিসংখ্যান এখন ফুটবলের মতো অনিশ্চয়তাপূর্ণ খেলাতেও সম্ভাব্য ফলাফল অনুমানের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!