যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৭ আশ্বিন ১৪৩৩

জন্মশতবর্ষে উত্তম কুমার: যে অভিনয় আজও বাঙালির আবেগের অংশ

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৬ PM ৫০
জন্মশতবর্ষে উত্তম কুমার: যে অভিনয় আজও বাঙালির আবেগের অংশ

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার। জন্মশতবর্ষে তার অভিনয়জীবন ও চলচ্চিত্রে অবদানের কথা নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমার এমন এক নাম, যার জনপ্রিয়তা সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও অটুট। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় চলচ্চিত্রে এসে পরিচিত হন উত্তম কুমার নামে। ২০২৬ সালে তার জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। পর্দায় তার হাসি, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং অভিনয়ের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি এখনও দর্শক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে স্মরণীয়।

উত্তম কুমারের চলচ্চিত্রজীবনের শুরুটা অবশ্য সাফল্যে ভরা ছিল না। ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেকের পর বেশ কয়েক বছর তাকে সংগ্রাম করতে হয়। একাধিক ছবিতে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ব্যর্থ অভিনেতা হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। পরে ‘বসু পরিবার’ ও ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বাংলা সিনেমায় নতুন জনপ্রিয়তার জন্ম দেয়।

পঞ্চাশের দশকে উত্তম কুমারের পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল রোমান্টিক নায়কের চরিত্র। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’ ও ‘সপ্তপদী’র মতো সিনেমায় প্রেম, আবেগ ও বিরহের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তবে তার অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল অতিরিক্ত নাটকীয়তার পরিবর্তে চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করা।

সময়ের সঙ্গে নিজের জনপ্রিয় ইমেজের মধ্যেই আটকে থাকেননি উত্তম কুমার। ষাটের দশকে তার অভিনয়ে দেখা যায় নতুন ধরনের পরিবর্তন। চরিত্রের গভীরে যাওয়ার পাশাপাশি জটিল ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেন তিনি। ‘এন্থনি ফিরিঙ্গি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চিড়িয়াখানা’ ও ‘নায়ক’-এর মতো সিনেমায় তার অভিনয়ের বৈচিত্র্য সেই পরিবর্তনকে স্পষ্ট করে।

সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬৬ সালের এই সিনেমায় তিনি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটি বাইরে থেকে সফল ও আত্মবিশ্বাসী হলেও তার ভেতরে ছিল ভয়, অনুশোচনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অতীতের নানা চাপ। উত্তম কুমার নিজের তারকা-পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে চরিত্রটির এই দ্বন্দ্বকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন।

‘নায়ক’ ছবির বিশেষত্ব শুধু এর গল্প বা নির্মাণে নয়, উত্তম কুমারের তারকা-ইমেজের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন সফল চলচ্চিত্র তারকার বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা ব্যক্তিমানুষের সংকটকে তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন। ফলে ছবিটি তার ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সত্তরের দশকেও উত্তম কুমারের অভিনয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। ‘অমানুষ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘মৌচাক’, ‘সব্যসাচী’ ও ‘দুই পৃথিবী’র মতো বিভিন্ন ঘরানার ছবিতে তাকে দেখা যায়। কখনো রহস্যময়, কখনো গম্ভীর, আবার কখনো সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন, জনপ্রিয় নায়কের পরিচয়ের বাইরেও তার অভিনয়ের ব্যাপ্তি ছিল অনেক বড়।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন উত্তম কুমার। প্রযোজনা ও পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য, সংগীত এবং গানেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে তিনি কেবল অভিনয়ের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি; নির্মাণের বিভিন্ন দিকেও নিজের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছিলেন।

তার ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে—সময় অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। পঞ্চাশের দশকে তিনি ছিলেন দর্শকের স্বপ্নের রোমান্টিক নায়ক। পরের দশকে তার চরিত্রগুলো হয়ে ওঠে আরও জটিল ও গভীর। সত্তরের দশকে এসে পরিণত অভিনেতা হিসেবে তার পরিচয় আরও দৃঢ় হয়। জনপ্রিয়তা ধরে রেখেও নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের এই ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

উত্তম কুমারের মৃত্যুর পরও তার অভিনয় নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তার বেশ কিছু কাজ নতুন দৃষ্টিতে মূল্যায়িত হয়েছে। তার সিনেমা এখন শুধু নস্টালজিয়ার অংশ নয়; অভিনয়, চলচ্চিত্রের ভাষা এবং তারকা-সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জন্মশতবর্ষে উত্তম কুমারকে ফিরে দেখার অর্থ তাই শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ককে স্মরণ করা নয়। এটি এমন একজন শিল্পীর অভিনয়যাত্রাকে মূল্যায়ন করা, যিনি নিজের জনপ্রিয়তার গণ্ডি পেরিয়ে বহুমাত্রিক অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। বাঙালির চলচ্চিত্র-স্মৃতিতে তার উপস্থিতি আজও অমলিন—আর সেই কারণেই উত্তম কুমার শুধু নায়ক নন, তিনি মহানায়ক।

উত্তম কুমার

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!