ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান সরকার নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করবে না বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও নতুন অস্থিরতা ঠেকাতে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যেই জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ইরানের অর্থনৈতিক চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক চাপের মুখে দেশের মানুষ ও সরকারের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাঁর মতে, বাইরের চাপের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে বিভাজন তৈরির যে কোনো উদ্যোগ জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ ঘোষণা করে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হিসেবে ইরান সরকার এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখার পথ সংকুচিত করার কথা বলা হয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের সরকারের নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন আসবে না বলে জানিয়েছেন পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অতিরিক্ত চাপ দেশের অভ্যন্তরে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে গত শুক্রবার দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের মধ্যে বিভেদ ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরেন।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে ইরানে অতীতের বিক্ষোভের প্রসঙ্গও এসেছে। বিশেষ করে ২০১৯ ও ২০২০ সালে জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও জ্বালানি নীতি নিয়ে চাপ রয়েছে। টেলিভিশনে দেওয়া সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, মানুষ ইতোমধ্যে নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর মধ্যেই ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্ধারিত তিন স্তরের পেট্রল কোটার একটি স্তরের দাম আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি মাসিক পেট্রল বরাদ্দও কমানোর কথা বলা হয়েছে।
ইরানের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক জ্বালানি পাচার, তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং তুলনামূলক বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী নিম্নমানের যানবাহনের ব্যাপক ব্যবহার।
পেট্রলের দাম বাড়লে পরিবহণ ব্যয় এবং পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপও আরও বাড়তে পারে। এমনিতেই দেশটির পরিবারগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপের আরেকটি বড় সূচক হিসেবে শনিবার তেহরানের বাজার খোলার পর ইরানি মুদ্রা রিয়ালের বড় দরপতনের কথা উঠে এসেছে। ওই দিন এক মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্য ২২ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল ছাড়িয়ে যায়, যা নতুন রেকর্ড নিম্নস্তর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সংকট, মুদ্রার দরপতন ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ইরান সরকারকে একদিকে কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য সামাজিক অস্থিরতা নিয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
ইরান মাসুদ পেজেশকিয়ান
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!