যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬,১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

একজন বিউটি রানী পাল ও প্রাথমিকে আমার শিক্ষক মালা ম্যাডাম

তৌফিক আহমেদ

তৌফিক আহমেদ

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫০ PM

৫৯
একজন বিউটি রানী পাল ও প্রাথমিকে আমার শিক্ষক মালা ম্যাডাম

মালা ম্যাডাম। একজন প্রধান শিক্ষক। তিনি জানেন কীভাবে তাঁর সন্তানতুল্য ছাত্রদের ভালোবাসা যায়। প্রতিদিন তিনি কোনো প্রতিদানের আশা না করেই তাঁর সন্তানসম শিক্ষার্থীদের মাঝে সে ভালোবাসা বিলিয়ে চলেছেন, তাঁদের সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়। ব্যক্তিস্বার্থ নয়, তাঁর চাওয়া কেবল শিক্ষার্থীদের সুন্দর আগামী। এমন হাজারো মালা ম্যাডাম নীরবে-নিভৃতে কাজ করে চলছেন সমাজ গঠনের কারিগর হয়ে। আমরা ক’জনই বা সে খোঁজ রাখি!

নিজের কথাই বলি।

আমি যেন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় আরও ভালো করি, সে জন্য আমার প্রধান শিক্ষক মালা ম্যাডাম আমাকে বৃত্তি পরীক্ষার ৮–১০ দিন আগে গ্রামের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিয়ে বগুড়ার বিমানবন্দরের কাছে তাঁর ফ্ল্যাটে রেখেছেন। নিজে এবং নিজের সন্তান যা খেতেন, আমাকেও তাই খাইয়েছেন। এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে হয়নি, আমি তাঁর সন্তান নই। ৮–১০ দিন পর আমি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম। করুণাময়ের ইচ্ছায় আমার উপজেলার ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ট্যালেন্টপুলে আমি ১৮তম স্থান লাভ করি। আমার স্কুলে ৬০ বছরের ইতিহাসে আমিই প্রথম বৃত্তি পাই। আমার আব্বু-আম্মু-ভাইয়ের পরে এই সাফল্যের সমস্ত কৃতিত্ব বিউটি রানী পালের মতোই এক প্রধান শিক্ষক—আমার মালা ম্যাডামের।

শুধু আমার বলি কেন, এমন অসংখ্য বিউটি রানী পাল, মালা ম্যাডামরা নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব একপাশে সরিয়ে রেখে কাজ করছেন প্রজন্ম গড়ে তুলতে। আমার মতো অসংখ্য শিশুর বুকে বুনে দিচ্ছেন এই বিশ্বাসের বীজ যে, তুমিও পারবে। তাঁদের হাত ধরেই তো সুন্দরকে ভালোবাসতে শিখেছি। তাঁদের কাছেই শিখেছি দেশপ্রেম। তাঁরাই তো শিখিয়েছেন, সত্যের জন্য লড়তে হয়। আমার ন্যায়-অন্যায় বোধের অনেকটাই তো তাঁদের গড়ে দেওয়া।

আজ যখন বিনা কারণে তাঁদের একজনকে দেখি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাঠগড়ায় আক্রমণে আক্রমণে রক্তাক্ত হতে, তখন বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়। একটি নির্দোষ মুহূর্তকে যারা নৈতিকতার নিক্তিতে তুলে ট্রলে মেতে ওঠেন, আমার মনে তাঁদের নৈতিকতা ও উদ্দেশ্য—দুটো নিয়েই প্রশ্ন জাগে।

বিউটি রানী পাল—একজন প্রধান শিক্ষক। তাঁরা জানেন কীভাবে তাঁদের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় আকৃষ্ট করতে হয়, তাঁদের বুকে স্বপ্ন বুনে দিতে হয়। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ২০১৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন। এই পেশা ও কর্মস্থল হিসেবে নগরের নাগরিক সুবিধা ছেড়ে অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বেছে নিতে বুকে সাহস লাগে। আর চাই সত্যিকারের ত্যাগের মানসিকতা। যে মানসিকতা আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

সবাই যখন নিজে ভালো থাকার স্বপ্ন আঁকড়ে মানুষ নয়, স্রেফ বডি হয়ে ইউরোপ-আমেরিকার স্বপ্নে সাগর পাড়ি দিচ্ছেন, তখন সব রকম যোগ্যতা ও সহজ পথ থাকার পরও বিউটি রানী পালেরা বেছে নিচ্ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিকে শিক্ষকতা—হতে চাইছেন মানুষ গড়ার কারিগর। তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকও হয়েছেন। তাঁদের ভালোবাসা এবং সংস্কৃতি কখনোই ভুল হতে পারে না। বিউটি রানী পালকে নিষিদ্ধ করে আমরা কি আমাদের সংস্কৃতি, সত্য এবং সুন্দরকেই নিষিদ্ধ করতে চাইছি? তবে কাল থেকেই নাচ-গান-নাট্য, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, এফডিসি—এগুলো আগে নিষিদ্ধ করা হোক।

আমিও ৫ বছর শিক্ষকতা করেছি, এখন সে পেশায় নেই। নইলে আমিও, ❝আজ কেন মন উদাসী হয়ে____❞ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গানটা গাইতাম।

আমি তৌফিক। উত্তরাধিকারসূত্রে আমার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিদাতা সদস্য। সরাসরি জড়িত বিধায় আমি জানি, কতটা প্রতিকূলতা ঠেলে একজন বিউটি রানী পাল বা মালা ম্যাডামরা স্বপ্ন বিলি করেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি ফুলবাগান হয়, তবে তাঁরা সে বাগানের মালী। আমরা যদি একটি সুন্দর আগামী চাই, রাষ্ট্রকে একটি সুশোভিত ফুলবাগান হিসেবে দেখতে চাই, তবে আজ সময় এসেছে এই মালীদের পাশে দাঁড়ানোর। এই দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি আমার-আপনার সবার।

বিউটি রানী পালকে ঘিরে যা হয়েছে, আমি তার তীব্র নিন্দা জানাই। আশার কথা, দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব তাঁদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, নইলে—মরে যাবে আমাদের আগামীর স্বপ্ন।

 

লেখক: সহসভাপতি, শিবগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদল, বগুড়া।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!