ছবি : সবুজ নিশান
সময় বদলায়। বদলায় মানুষের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, পোশাক, প্রযুক্তি, যোগাযোগের ধরন। একসময় দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চিঠির অপেক্ষা করতে হতো; এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই বার্তা পৌঁছে যায়। একসময় তথ্যের জন্য বইয়ের পাতা উল্টাতে হতো; এখন হাতের মুঠোয় থাকা একটি যন্ত্রেই পৃথিবীর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। আমরা আধুনিক হয়েছি—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
প্রযুক্তির দিক থেকে আমরা যতটা এগিয়েছি, মানুষ হিসেবে কি ততটাই এগিয়েছি? আমাদের ঘরগুলো বড় হয়েছে, কিন্তু হৃদয় কি বড় হয়েছে? যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, অথচ মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কি কমেছে? আমরা অন্যের জীবনের খবর মুহূর্তেই জানতে পারি, কিন্তু পাশের ঘরে থাকা মানুষটির মনের খবর কি রাখি?
আধুনিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো প্রযুক্তি নয়; আধুনিকতার প্রকৃত পরিচয় মানুষের আচরণে। একটি সমাজ কতটা আধুনিক, তা শুধু তার উঁচু ভবন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট কিংবা আধুনিক যানবাহন দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয়—সেই সমাজে দুর্বল মানুষের প্রতি আচরণ কেমন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধ কতটা, ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সম্মান কতটা, বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা কতটা?
একসময় আমাদের সমাজে ‘মানুষ’ পরিচয়টাই ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়। পাড়া-প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখে মানুষ ছুটে যেত। কারও বাড়িতে অসুস্থতা হলে খবর নেওয়া ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। অতিথি এলে নিজের সামর্থ্যের সীমার মধ্যেই তাকে আপ্যায়ন করার চেষ্টা থাকত। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল শুধু দরজার ওপাশে থাকা একজন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নয়; বরং এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা।
আজ আমরা অনেক বেশি সংযুক্ত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি একা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের শত শত, কখনো হাজারো পরিচিতি। কারও জন্মদিন, ভ্রমণ, সাফল্য, আনন্দ—সবই আমাদের চোখের সামনে। আমরা ‘লাইক’ দিই, মন্তব্য করি, অভিনন্দন জানাই। অথচ বাস্তব জীবনে হয়তো সেই মানুষটির সঙ্গে বছরের পর বছর একটি কথাও হয় না। ভার্চুয়াল সম্পর্কের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আন্তরিক সম্পর্কের গভীরতা কি বাড়ছে?
আরেকটি পরিবর্তন চোখে পড়ে আমাদের কথাবার্তায়। ভিন্ন মতকে সহ্য করার ক্ষমতা যেন ক্রমেই কমছে। মতের অমিল হলেই আমরা মানুষটিকে বিচার করতে শুরু করি। যুক্তির জায়গায় আসে অপমান, আলোচনার জায়গায় আসে আক্রমণ। অথচ সভ্যতার সৌন্দর্যই হলো—দুজন মানুষ ভিন্নভাবে চিন্তা করেও পরস্পরকে সম্মান করতে পারে।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, ভিন্ন মত মানেই শত্রুতা নয়।
নৈতিকতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ স্পষ্ট। ছোটখাটো অসততাকে আমরা অনেক সময় ‘চালাকি’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই। অন্যের অধিকার সামান্য লঙ্ঘন করাকে বড় অপরাধ মনে হয় না। রাস্তায় নিয়ম ভাঙা, লাইনে দাঁড়াতে অনীহা, পরিচিতির জোরে নিজের কাজ আগে করিয়ে নেওয়া—এসবকে আমরা কখনো কখনো এমনভাবে দেখি, যেন এগুলো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু সমাজের বড় দুর্নীতিগুলোও তো ছোট ছোট অসততার ওপর দাঁড়ায়।
একজন মানুষ যখন ভাবে, ‘আমি একটু নিয়ম ভাঙলে কী হবে?’ তখন হয়তো তার নিজের ক্ষতি খুব সামান্য। কিন্তু একই চিন্তা যখন হাজার হাজার মানুষ করে, তখন পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। মূল্যবোধের অবক্ষয় সবসময় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না; অনেক সময় তা শুরু হয় ছোট একটি আপস থেকে।
তবে এই সময়কে শুধু দোষারোপ করাও ঠিক হবে না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে অসাধারণ মানবিকতাও আছে। তরুণরা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, রক্তদানের উদ্যোগ নেয়, অসহায় মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে। প্রযুক্তিকে তারা শুধু বিনোদনের জন্য নয়, শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগের জন্যও ব্যবহার করছে। অর্থাৎ মূল্যবোধ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং তার প্রকাশের ধরন বদলেছে।
সমস্যা তখনই, যখন বাহ্যিক সাফল্যকে আমরা মানবিকতার চেয়ে বড় করে দেখি। একজন মানুষ কত টাকা উপার্জন করেন, কোথায় থাকেন, কী গাড়িতে চলেন, কত অনুসারী আছে—এসব দিয়ে তার মূল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চরিত্রে।
একজন দরিদ্র মানুষও মহান হতে পারেন। আবার বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও কেউ নৈতিকভাবে দরিদ্র হতে পারেন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও তাই একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—আমরা কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য সন্তানদের প্রস্তুত করছি, নাকি ভালো মানুষ হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করছি? একজন শিক্ষার্থী গণিতে শতভাগ নম্বর পেল, কিন্তু দুর্বল সহপাঠীকে অপমান করল—তাহলে তার শিক্ষার কতটা পূর্ণতা পেল? একজন তরুণ উচ্চশিক্ষিত হলো, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণে মানবিকতা হারাল—তাহলে সেই শিক্ষা কি কেবল তথ্য অর্জনেই সীমাবদ্ধ রইল না? শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু জীবিকা অর্জন নয়; মানুষ তৈরি করাও।
পরিবারও মূল্যবোধ গঠনের প্রথম বিদ্যালয়। সন্তানকে আমরা প্রায়ই বলি—‘ভালো রেজাল্ট করো’, ‘জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও’, ‘ভালো চাকরি করো’। কিন্তু কতবার বলি—‘সত্য কথা বলো’, ‘দুর্বল কাউকে কষ্ট দিও না’, ‘ভুল করলে ক্ষমা চাও’, ‘অন্যের অধিকারকে সম্মান করো’? সম্ভবত এখানেই আমাদের নতুন করে ভাবার প্রয়োজন।
আধুনিক হওয়া মানে পুরোনো সবকিছু ফেলে দেওয়া নয়। সমাজের ক্ষতিকর কুসংস্কার, বৈষম্য ও অমানবিকতা অবশ্যই বদলাতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের পুরোনো কিছু সুন্দর মূল্যবোধ—বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ, অতিথিপরায়ণতা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসবও ধরে রাখতে হবে।
কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষকে মানুষের কাছাকাছি আনে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি ফোনের পর্দায় পৃথিবীকে দেখা যায়; কিন্তু সেই পর্দা যেন আমাদের বাস্তব পৃথিবীকে আড়াল না করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি যেন নিজের পরিবারের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময়ও আমাদের থাকে। ব্যস্ততার অজুহাতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ফোন যেন বিরক্তির কারণ না হয়। প্রতিবেশীর বিপদ যেন ‘ওটা তার ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে পাশ কাটিয়ে না যাই। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব কখনো পুরোনো হয় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই ‘আমরা আধুনিক হয়েছি কি না’—এটা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমাদের আধুনিকতা আমাদের কতটা মানবিক করেছে।
নতুন প্রযুক্তি আমাদের হাতে শক্তি দিয়েছে। কিন্তু সেই শক্তি কীভাবে ব্যবহার করব, তা নির্ধারণ করে আমাদের মূল্যবোধ। জ্ঞান আমাদের অনেক কিছু জানতে শেখায়, কিন্তু বিবেক শেখায় কোনটা করা উচিত আর কোনটা উচিত নয়। প্রযুক্তি আমাদের দ্রুত করেছে, কিন্তু মূল্যবোধই ঠিক করে দেয় আমরা কোন পথে যাব।
হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি নতুন প্রযুক্তি নয়; প্রয়োজন নিজের ভেতরের মানুষটিকে একটু নতুন করে আবিষ্কার করা।
আমরা আধুনিক হব—এটাই স্বাভাবিক। সময়কে থামিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু আধুনিকতার পথে হাঁটতে গিয়ে যেন মানবিকতার হাতটি ছেড়ে না দিই।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন তার সম্পদ নয়, তার পরিচিতির সংখ্যা নয়, তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও নয়।
সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—অনেক দূর এগিয়েও সে যেন মানুষ হয়ে থাকতে পারে।
মূল্যবোধ প্রযুক্তি আধুনিক
যথার্থ। লেখকের জন্য শুভকামনা।
২৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৫ PM